বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ ও যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অবদান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত। ১৯৮৮ সালে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণের পর থেকে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী ধারাবাহিকভাবে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শান্তিরক্ষী বাহিনী হিসেবে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে।
আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস উপলক্ষে এক বিশেষ আলোচনায় কঙ্গোতে দায়িত্ব পালন করা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। আলোচনায় অংশ নেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ ইমদাদুল হক, জেনারেল মাহবুব হায়দার খান এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবু মুসা শারফ্উদ্দিন।
তাদের বর্ণনায় উঠে আসে আফ্রিকার খনিজসম্পদে সমৃদ্ধ দেশ ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর দীর্ঘ সংঘাতের ইতিহাস এবং সেখানে শান্তি ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের অসাধারণ ভূমিকা। কঙ্গোতে দীর্ঘদিন ধরে জাতিগত সংঘাত, বিদ্রোহী গোষ্ঠীর তৎপরতা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করছিল। ১৯৯৯ সালে লুসাকা শান্তিচুক্তির পর জাতিসংঘ সেখানে শান্তিরক্ষা মিশন মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ২০০৩ সাল থেকে কঙ্গো মিশনে সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালন করছে। দেশটির পূর্বাঞ্চলের দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বাংলাদেশি সেনারা শুধু নিরাপত্তা নিশ্চিত করেননি, বরং সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
মিশনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ‘চ্যাপ্টার সেভেন’ অপারেশন। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এই বিশেষ অনুমোদনের আওতায় শান্তিরক্ষীরা শুধু আত্মরক্ষার জন্য নয়, বরং সাধারণ নাগরিক ও জাতিসংঘ কর্মীদের সুরক্ষায় প্রয়োজন হলে সরাসরি সামরিক অভিযান পরিচালনার ক্ষমতা পায়। কঙ্গো ছিল এমন কয়েকটি বিরল মিশনের একটি, যেখানে এই ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয়েছে।
বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা ‘অপারেশন বোগা’, ‘ইতুরি এক্সপ্লোরার’সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অভিযানে অংশ নেয়। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, ঘন জঙ্গল, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং বিদ্রোহীদের সশস্ত্র প্রতিরোধের মধ্যেও তারা সফলভাবে অভিযান পরিচালনা করেন। বিশেষ করে ‘চে’ অঞ্চলে পরিচালিত অভিযান কঙ্গো মিশনের অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, বিভিন্ন দেশের সেনাদের নিয়ে গঠিত যৌথ বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করাও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। ভাষাগত পার্থক্য, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং ভিন্ন সামরিক কৌশল থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশি সেনারা দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন।
এ পর্যন্ত বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ১৭৪ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী প্রাণ উৎসর্গ করেছেন। এই আত্মত্যাগকে বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসের অন্যতম গৌরবময় অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শান্তিরক্ষীদের এই ত্যাগ ও বীরত্ব আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে।
বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের সফলতার ফলে কঙ্গোর বহু অঞ্চলে সহিংসতা কমেছে, সাধারণ মানুষ নিরাপদে বসবাসের সুযোগ পেয়েছে এবং দেশটির ইতিহাসে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজন সম্ভব হয়েছে। মিশনে অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা মনে করেন, বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রের এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পেশাদার দক্ষতা ও কৌশলগত সক্ষমতা আরও সমৃদ্ধ করেছে।
বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের এই অবদান শুধু সামরিক সক্ষমতারই নয়, মানবিক দায়িত্ববোধ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতারও এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
কসমিক ডেস্ক