প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেছেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কোনো নির্দিষ্ট দেশকেন্দ্রিক হবে না। বরং জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব এবং পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে দেশটি বহুমাত্রিক ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থান বজায় রাখবে।
শনিবার রাজধানীতে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ (বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ) আয়োজিত “সবার আগে বাংলাদেশ : নতুন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির দৃষ্টিভঙ্গি” শীর্ষক এক আলোচনায় তিনি এ মন্তব্য করেন। অনুষ্ঠানে তিনি দেশের ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতির কাঠামো, বৈশ্বিক বাস্তবতা এবং কৌশলগত দিক নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দেন।
হুমায়ুন কবির বলেন, বর্তমান বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একক শক্তির আধিপত্যের যুগ ধীরে ধীরে শেষ হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন কৌশলগতভাবে নমনীয় ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশ সব দেশের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখবে, তবে কোনো নির্দিষ্ট দেশের ওপর নির্ভরশীল হবে না। জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রেখে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণই হবে সরকারের মূল লক্ষ্য।”
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা আরও জানান, সরকারের নতুন পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রীয় ধারণা হলো “বাংলাদেশ ফার্স্ট”। এই নীতির ভিত্তিতে বাংলাদেশ একটি বহুমাত্রিক, বাস্তববাদী ও সুযোগভিত্তিক কূটনৈতিক অবস্থান তৈরি করতে চায়। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক হবে প্রয়োজনে সহযোগিতামূলক, আবার কোথাও প্রয়োজন হলে স্বতন্ত্র সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতাও থাকবে।
অর্থনৈতিক কূটনীতিকে তিনি নতুন পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ, বৈচিত্র্যময় বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য ও যোগাযোগ বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের মধ্যে একটি অর্থনৈতিক সেতুবন্ধন হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে দেশটির ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে উন্নয়ন ও বাণিজ্যকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশ এই অঞ্চলে অন্তর্ভুক্তিমূলক, উন্মুক্ত ও সহযোগিতামূলক অবস্থান সমর্থন করে। তবে দেশটি কোনো শক্তি ব্লকের পক্ষ নেবে না। বরং বাণিজ্য, সংযোগ, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং টেকসই উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট উদ্যোগে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের এই অবস্থান বৈশ্বিক শক্তির প্রতিযোগিতার মধ্যেও একটি ব্যালান্সড ডিপ্লোমেসির ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ছোট ও মাঝারি অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য এ ধরনের নীতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত অংশগ্রহণকারীরাও মনে করেন, পরিবর্তনশীল বিশ্বে বাংলাদেশকে তার অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় আরও সক্রিয় ও বাস্তবসম্মত পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করতে হবে।
সব মিলিয়ে হুমায়ুন কবিরের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, ভবিষ্যতের বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো একক নির্ভরতার পথে যাবে না, বরং বহুমুখী ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চায়।
কসমিক ডেস্ক