মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুট হরমুজ প্রণালী ঘিরে আবারও উত্তেজনা বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান টানাপোড়েনের মধ্যেই মার্কিন সামরিক পাহারায় একটি বাণিজ্যিক জাহাজ এই প্রণালী পার হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।
বিশ্বখ্যাত শিপিং কোম্পানি ম্যারস্ক জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের পতাকাবাহী একটি বাণিজ্যিক জাহাজ ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ উদ্যোগের আওতায় নিরাপদে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, জাহাজটি মার্কিন সামরিক বাহিনীর সরাসরি পাহারায় ছিল এবং কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই যাত্রা সম্পন্ন করেছে। জাহাজের সব ক্রু সদস্যও নিরাপদ ও অক্ষত রয়েছেন।
পটভূমিতে রয়েছে সাম্প্রতিক সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ হামলার পর ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিদেশি জাহাজ চলাচলে অবরোধ আরোপ করে। এই পদক্ষেপের জবাবে ১৩ এপ্রিল ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানি বন্দর ব্যবহারের ওপর পাল্টা নিষেধাজ্ঞা দেন।
এই পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় অঞ্চলে আটকে পড়া জাহাজগুলোকে নিরাপদে বের করে আনতে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে একটি উদ্যোগ ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, এই উদ্যোগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই রুটে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করা হবে।
এই অভিযানে যুক্ত রয়েছে শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতি—গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার, শতাধিক আকাশ ও সমুদ্রভিত্তিক যুদ্ধবিমান, উন্নত ড্রোন প্ল্যাটফর্ম এবং প্রায় ১৫ হাজার সেনা সদস্য। ফলে বোঝা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় ধরনের সামরিক প্রস্তুতি নিয়েছে।
এদিকে, হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হয়েছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ-এ নতুন একটি প্রস্তাব আনার উদ্যোগ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় আরব দেশগুলো। এই প্রস্তাবে হরমুজে জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার অভিযোগে ইরানকে দায়ী করা হতে পারে এবং তাদের সামরিক কর্মকাণ্ড বন্ধের আহ্বান জানানো হবে।
জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ জানিয়েছেন, এই প্রস্তাবের খসড়া প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং চলতি সপ্তাহেই তা নিয়ে আলোচনা শুরু হতে পারে। তার মতে, ইরানের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইন ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুট। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়ে বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়। তাই এখানে কোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পাহারায় জাহাজ চলাচল একদিকে যেমন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা, অন্যদিকে এটি উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইরান যদি এই পদক্ষেপকে উসকানি হিসেবে দেখে, তাহলে সংঘাত আরও তীব্র হতে পারে।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালী ঘিরে পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত স্পর্শকাতর। সামরিক ও কূটনৈতিক পদক্ষেপের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর এখন এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের দিকে, যেখানে সামান্য ভুল পদক্ষেপই বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি করতে পারে।
কসমিক ডেস্ক