বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোক্যাল ট্রেড (এআরটি)’ নিয়ে নতুন করে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। ৩২ পৃষ্ঠার এই চুক্তিতে বাংলাদেশের ওপর যে পরিমাণ বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে, তা তুলনামূলকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার চেয়ে অনেক বেশি— এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।
চুক্তির ভাষাগত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ‘shall’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে ১৭৯ বার, যেখানে ‘will’ শব্দটি মাত্র ৩ বার। এর মধ্যে ‘বাংলাদেশ shall’ এসেছে ১৩১ বার, আর ‘US shall’ মাত্র ৬ বার। আন্তর্জাতিক চুক্তির ভাষায় ‘shall’ মানে বাধ্যতামূলক নির্দেশনা, আর ‘will’ সাধারণত ইচ্ছাধীন বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ইঙ্গিত দেয়। ফলে এই শব্দচয়ন থেকেই বোঝা যায়, চুক্তির ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন উঠার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
চুক্তির প্রথম ধারা শুল্ক ও কোটাকে কেন্দ্র করে। এখানে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর নির্ধারিত শুল্ক বজায় রাখা এবং কোটা না দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে অশুল্ক বাধা—যেমন লাইসেন্স, অনুমোদন বা মান যাচাইয়ের মতো বিষয়েও কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে, যাতে মার্কিন পণ্যের প্রবেশে কোনো বাধা না থাকে।
কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার বিষয়টিও উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশকে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও কৃষিপণ্যের মান ও সনদ গ্রহণ করতে হবে এবং অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা যাবে না। এমনকি স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিধিনিষেধও বিজ্ঞানভিত্তিক হতে হবে এবং তা যেন বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত না করে।
ডিজিটাল বাণিজ্য খাতেও যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। বাংলাদেশ এমন কোনো কর বা নীতি গ্রহণ করতে পারবে না, যা মার্কিন ডিজিটাল সেবার বিরুদ্ধে বৈষম্য তৈরি করে। পাশাপাশি সীমান্ত পেরিয়ে ডেটা আদান-প্রদানের ক্ষেত্রেও বাধাহীন পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো মেধাস্বত্ব সুরক্ষা। বাংলাদেশকে কপিরাইট, ট্রেডমার্ক ও পেটেন্ট সংক্রান্ত কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চুক্তিতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যোগ দিতে হবে। এতে করে দেশীয় শিল্পের ওপর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে।
বিনিয়োগ খাতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উন্মুক্ত সুযোগ তৈরির বিষয়টিও স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। জ্বালানি, টেলিযোগাযোগ, অবকাঠামোসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে মার্কিন বিনিয়োগ সহজ করতে হবে এবং তাদের দেশীয় বিনিয়োগকারীদের মতোই সুবিধা দিতে হবে। এমনকি বিদেশে অর্থ পাঠানো ও আনার প্রক্রিয়াও সহজ করতে বলা হয়েছে।
শ্রম আইন ও পরিবেশ সুরক্ষার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশকে বেশ কিছু সংস্কার আনতে বলা হয়েছে। শ্রমিকদের সংগঠন করার স্বাধীনতা, ধর্মঘটের অধিকার এবং ইপিজেডে ইউনিয়ন গঠনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষা, বন ব্যবস্থাপনা এবং অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্য রোধেও কঠোর পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতির দিকটি তুলনামূলকভাবে সীমিত। তারা মূলত কিছু পণ্যে শুল্ক সুবিধা দেওয়ার কথা বলেছে, তাও নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে। অর্থাৎ বাংলাদেশ কতটা মার্কিন কাঁচামাল আমদানি করছে, তার ওপর নির্ভর করবে এই সুবিধা।
সব মিলিয়ে এই চুক্তিকে অনেকেই একতরফা বা ভারসাম্যহীন হিসেবে দেখছেন। কারণ, যেখানে বাংলাদেশকে বিভিন্ন খাতে বিস্তৃত সংস্কার ও বাধ্যবাধকতা পালন করতে হচ্ছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা তুলনামূলকভাবে খুবই কম।
বিশ্লেষকদের মতে, এমন চুক্তি বাস্তবায়নের আগে জাতীয় স্বার্থ, স্থানীয় শিল্প এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রভাব বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় এটি দেশের অর্থনীতিতে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি করতে পারে।
কসমিক ডেস্ক