বান্দরবানের দুর্গম থানচি উপজেলার তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় অবশেষে সরকারি স্বীকৃতি পেয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ সোমবার (১৩ জুলাই) প্রজ্ঞাপন জারি করে বিদ্যালয়টিকে সরকারি ঘোষণা করেছে। এর ফলে এখন থেকে প্রতিষ্ঠানটির নতুন নাম হবে ‘তিন্দু সরকারি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়’।
এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে শেষ হলো দীর্ঘদিনের আর্থিক অনিশ্চয়তা। বিশেষ করে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেন, যিনি শিক্ষকদের বেতন জোগাতে ছুটির দিনে ইঞ্জিনচালিত নৌকা চালিয়ে পর্যটক ও যাত্রী পরিবহন করতেন, তার সংগ্রামেরও অবসান ঘটছে।
শিক্ষকদের বেতন দিতে নৌকা চালাতেন প্রধান শিক্ষক
২০২০ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ৫৬ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। অধিকাংশ শিক্ষার্থী দরিদ্র পরিবারের হওয়ায় নিয়মিত বেতন দিতে পারত না। ফলে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধে দীর্ঘদিন ধরে সংকট তৈরি হয়।
এই সংকট মোকাবিলায় প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেন ছুটির দিনগুলোতে থানচি–তিন্দু–রেমাক্রী নৌপথে ইঞ্জিনচালিত নৌকা চালিয়ে অতিরিক্ত আয় করতেন। সেই আয়ের একটি বড় অংশ তিনি সহকর্মীদের বেতন পরিশোধে ব্যয় করতেন।
চলতি বছরের মার্চ ও এপ্রিল মাসে নৌকা চালিয়ে তিনি প্রায় ৪০ হাজার টাকা আয় করেন। এর মধ্যে প্রায় ৩০ হাজার টাকা বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন হিসেবে প্রদান করেন। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে তার এই আত্মত্যাগ দেশজুড়ে প্রশংসা কুড়ায়।
সরকারি প্রজ্ঞাপনে যা বলা হয়েছে
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ১৩ জুলাই থেকে বান্দরবান জেলার থানচি উপজেলার তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়কে সরকারি ঘোষণা করা হলো। একই সঙ্গে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মচারীদের আত্তীকরণ করা হবে।
তবে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে, আত্তীকৃত শিক্ষক ও কর্মচারীদের চাকরি বদলিযোগ্য হবে না।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে শুরু হয় জাতীয়করণের উদ্যোগ
এর আগে জাতীয় সংসদে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছিলেন, বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা পাওয়া গেছে এবং প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শুরু হবে।
প্রধান শিক্ষকের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ও বিদ্যালয়টির বাস্তব চিত্র গণমাধ্যমে প্রকাশের পর বিষয়টি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নজরে আসে। এরপর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বিদ্যালয়টিকে সরকারি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
স্বস্তি ফিরল শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মাঝে
সরকারি ঘোষণার ফলে এখন বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও স্থিতিশীল হবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা আরও উন্নত শিক্ষাসেবা পাবে।
বামং খিয়াং মিংলেনের ত্যাগ ও দায়িত্ববোধ শুধু একটি বিদ্যালয়কে টিকিয়ে রাখেনি, বরং দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকদের এক অনন্য উদাহরণ হিসেবেও স্থান করে নিয়েছে।
কসমিক ডেস্ক