যে হাত গড়েছিল ২০১ গম্বুজ মসজিদ, সেই কারিগরের চিরবিদায় The Daily Cosmic Post
ঢাকা | বঙ্গাব্দ
ঢাকা |

যে হাত গড়েছিল ২০১ গম্বুজ মসজিদ, সেই কারিগরের চিরবিদায়

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Apr 5, 2026 ইং
যে হাত গড়েছিল ২০১ গম্বুজ মসজিদ, সেই কারিগরের চিরবিদায় ছবির ক্যাপশন:

টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর উপজেলার দক্ষিণ পাথালিয়া গ্রামের নীরব আকাশ যেন আজ একটু বেশি ভারী। বিশ্বখ্যাত ২০১ গম্বুজ মসজিদ—যার প্রতিটি ইট, প্রতিটি গম্বুজ, প্রতিটি কারুকাজে লুকিয়ে আছে এক মানুষের নিবিড় শ্রম, নিখুঁত দৃষ্টি আর অনবদ্য শিল্পবোধ—সেই নিপুণ কারিগর মিজানুর রহমান আজ আর আমাদের মাঝে নেই। রবিবার দুপুর ১২টা ৩০ মিনিটে পটুয়াখালির মির্জাগঞ্জে নিজ বাড়িতে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬০ বছর।

মিজানুর রহমান কেবল একজন রাজমিস্ত্রী ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন শিল্পী, একজন স্রষ্টা, একজন নিঃশব্দ নির্মাতা—যার হাতে ইট-পাথর যেন কথা বলত। তার ছোঁয়ায় সাধারণ নির্মাণকাজ রূপ নিত নান্দনিক শিল্পে। ২০১ গম্বুজ মসজিদের প্রতিটি নকশা, প্রতিটি রেখা, প্রতিটি সূক্ষ্ম কারুকাজ তার সৃজনশীলতা ও দক্ষতার জীবন্ত সাক্ষ্য বহন করে।

বিশেষ করে মসজিদের ভেতরে প্রায় ৫ টন পিতলের ওপর খোদাই করা পূর্ণাঙ্গ কুরআন শরীফ—যা এই স্থাপনাটিকে করেছে অনন্য ও বিরল—তারই অক্লান্ত পরিশ্রম ও ধৈর্যের ফল। প্রতিটি অক্ষর, প্রতিটি আয়াত খোদাই করার পেছনে যে নিষ্ঠা, সময় ও মনোযোগ প্রয়োজন, তা কেবল একজন নিবেদিতপ্রাণ কারিগরের পক্ষেই সম্ভব।

মসজিদের প্রধান ফটকের উপরে পিতল দিয়ে আল্লাহ তায়ালার পবিত্র ৯৯টি নাম স্থাপন—এটিও তার দক্ষতার আরেক অনন্য নিদর্শন। এই কাজগুলো শুধু স্থাপত্য নয়, বরং একধরনের ইবাদত হিসেবেই তিনি গ্রহণ করেছিলেন বলে জানান তার সহকর্মীরা।

এছাড়া মসজিদের দক্ষিণ পাশে নির্মাণাধীন ৪৫১ ফুট উচ্চতার মিনার—যা ৫৭ তলা সমতুল্য—তার কাজের আরেক বিস্ময়কর অধ্যায়। এই বিশাল প্রকল্পের জন্য ৪৪১টি পাইলিংয়ের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল তার নেতৃত্বে। দিন-রাত পরিশ্রম করে তিনি এই কাজ এগিয়ে নিয়ে গেছেন, যেন নিজের জীবনের একটি স্বপ্ন বাস্তবায়ন করছেন। কিন্তু নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই তিনি বিদায় নিলেন—এ যেন এক অপূর্ণ অধ্যায়ের মতো থেকে গেল।

তার হঠাৎ মৃত্যুতে পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম কল্যাণ ট্রাস্ট-এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামসহ মসজিদ পরিবারের সদস্য, স্থানীয় গ্রামবাসী এবং সর্বস্তরের মানুষ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তারা মনে করেন, মিজানুর রহমান শুধু একজন শ্রমিক ছিলেন না; তিনি ছিলেন এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার প্রাণ।

তার মৃত্যুর খবরে অনেকেই স্মৃতিচারণ করে বলেছেন, তিনি ছিলেন অত্যন্ত পরিশ্রমী, নম্র ও নীরব স্বভাবের মানুষ। কাজের প্রতি তার দায়বদ্ধতা ছিল অসাধারণ। কখনো ক্লান্তি বা বিরক্তি প্রকাশ না করে দিনের পর দিন তিনি কাজ করে গেছেন। তার কাছে কাজ মানেই ছিল দায়িত্ব, আর দায়িত্ব মানেই ছিল ইবাদত।

মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, তিন কন্যা ও এক পুত্র রেখে গেছেন। পরিবারের জন্য তিনি ছিলেন একমাত্র অবলম্বন। তার এই আকস্মিক চলে যাওয়া শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং একটি পুরো সম্প্রদায়ের জন্য বড় ক্ষতি।

মরহুমের আত্মার মাগফেরাত কামনায় আগামী পাঁচ দিন ২০১ গম্বুজ মসজিদ-এ প্রতি ওয়াক্ত নামাজের পর দোয়ার আয়োজন করা হয়েছে। পাশাপাশি আগামী ১০ এপ্রিল (শুক্রবার) জুমার নামাজের পর বিশেষ দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। এতে অংশগ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে আহ্বান জানিয়েছেন আয়োজকরা।

এই দোয়া মাহফিলে উপস্থিত হয়ে সবাই যেন তার জন্য দোয়া করেন—এমনটাই প্রত্যাশা করেছেন আয়োজকরা। কারণ একজন মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো মানুষের ভালোবাসা ও দোয়া, যা মিজানুর রহমান তার কর্ম ও আচরণের মাধ্যমে অর্জন করেছিলেন।

যে হাত গড়েছিল ২০১ গম্বুজ মসজিদের অনন্য সৌন্দর্য, যে হাতের ছোঁয়ায় ইট-পাথর পেয়েছিল প্রাণ, সেই হাত আজ চিরতরে থেমে গেছে। কিন্তু তার রেখে যাওয়া কাজ, তার সৃষ্টি, তার শিল্প—এসবই তাকে বাঁচিয়ে রাখবে যুগের পর যুগ।

সময়ের প্রবাহে মানুষ হারিয়ে যায়, কিন্তু কিছু মানুষ তাদের কাজের মাধ্যমে অমর হয়ে থাকেন। মিজানুর রহমান ছিলেন তেমনই একজন নিপুণ কারিগর—যার গল্প, যার সৃষ্টি এবং যার শ্রম আগামী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : কসমিক ডেস্ক

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
নিয়োগ নীতির প্রতিবাদে দুই ঘণ্টা মহাসড়ক অবরোধ

নিয়োগ নীতির প্রতিবাদে দুই ঘণ্টা মহাসড়ক অবরোধ