রাজধানীর বেইলি রোডে ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারির ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৪৬ জনের মৃত্যুর ঘটনায় দুই বছর পর তদন্ত শেষ করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এই তদন্তে উঠে এসেছে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য, যা পুরো ঘটনাকে নতুনভাবে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
সিআইডির অভিযোগপত্র অনুযায়ী, আগুন লাগার পর গ্রিন কোজি কটেজ ভবনের একটি রেস্টুরেন্টে থাকা গ্রাহকদের বের হতে বাধা দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগে বলা হয়েছে, Kacchi Bhai রেস্টুরেন্টের ব্যবস্থাপক জিসানের নির্দেশে দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়, যাতে কোনো গ্রাহক বিল না দিয়ে বের হতে না পারেন।
এই সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ পরিণতির দিকে নিয়ে যায় বলে মনে করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে এবং পরবর্তীতে আগুনে দগ্ধ হয়ে ওই রেস্টুরেন্টে থাকা অধিকাংশ মানুষ প্রাণ হারান।
ঘটনার সময় ভবনটিতে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি ভিড় ছিল, কারণ লিপইয়ার উপলক্ষে সেখানে বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়েছিল। ফলে আগুন লাগার পর দ্রুত বের হওয়ার সুযোগ অনেকেই পাননি।
তদন্তে আরও জানা গেছে, ভবনটিতে একাধিক বড় ধরনের নিরাপত্তা ত্রুটি ছিল। নিয়ম না মেনে একই ভবনে একাধিক রেস্টুরেন্ট পরিচালনা, সিঁড়িতে গ্যাস সিলিন্ডার রাখা এবং জরুরি নির্গমন পথ না থাকা—এসব কারণ অগ্নিকাণ্ডের ক্ষয়ক্ষতি বাড়িয়ে দেয়।
Green Cozy Cottage ভবনের বিভিন্ন তলায় থাকা মানুষ আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর ছাদে আশ্রয় নিতে চেষ্টা করেন। কিন্তু অবৈধভাবে তৈরি করা ডুপ্লেক্স রেস্টুরেন্টের কারণে সেখানেও নিরাপদ অবস্থান তৈরি হয়নি।
অনেকে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার চেষ্টা করলেও সিঁড়িতে রাখা গ্যাস সিলিন্ডার ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতার কারণে তা সম্ভব হয়নি। ফলে তারা কার্যত একটি ফাঁদে আটকা পড়ে যান।
সিএমএম কোর্টের অতিরিক্ত পিপি মুহাম্মদ শামছুদ্দোহা সুমন জানিয়েছেন, ভবনটির বিভিন্ন স্থানে ব্যবহৃত ও অব্যবহৃত গ্যাস সিলিন্ডার রাখা ছিল এবং কোনো কার্যকর বহির্গমন পথ ছিল না। এসব অব্যবস্থাপনার কারণেই অধিকাংশ মানুষ ধোঁয়ায় শ্বাসরোধ হয়ে মারা যান।
সিআইডির তদন্তে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ভবনের নিচতলায় থাকা একটি কফি শপের বৈদ্যুতিক কেটলি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। এরপর দ্রুত আগুন পুরো ভবনে ছড়িয়ে পড়ে।
এই ঘটনায় ভবনের মালিকপক্ষসহ মোট ২২ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন গ্রেফতারের পর জামিনে রয়েছেন, অন্যরা এখনও পলাতক।
সব মিলিয়ে, বেইলি রোডের এই মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ড শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং অব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ত্রুটি এবং দায়িত্বহীনতার একটি সম্মিলিত চিত্র তুলে ধরেছে। তদন্তের মাধ্যমে উঠে আসা তথ্যগুলো ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কসমিক ডেস্ক