মাত্র তিন ঘণ্টার টানা মুষলধারে বৃষ্টিতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে কুমিল্লা নগরী। আকস্মিক ১০৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতে শহরের প্রধান সড়ক, অলিগলি এবং আবাসিক এলাকার বিস্তীর্ণ অংশ পানির নিচে চলে গেছে। কোথাও হাঁটুসমান, আবার কোথাও কোমরসমান পানি জমে নগরবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
সোমবার ভোর থেকে শুরু হওয়া ভারী বর্ষণে রাস্তাঘাট উপচে নোংরা পানি সরাসরি বহু বাসাবাড়ির শোবার ঘর ও রান্নাঘরে ঢুকে পড়ে। ফলে হাজারো পরিবার কার্যত পানিবন্দি হয়ে পড়ে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন পরীক্ষার্থী, দিনমজুর, নিম্ন আয়ের মানুষ এবং কর্মজীবীরা।
ভারী বৃষ্টির কারণে নগরীর বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। অফিসগামী মানুষকে দীর্ঘ সময় জলাবদ্ধ সড়ক পাড়ি দিতে হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের অনেককে কাকভেজা অবস্থায় স্কুল-কলেজে যেতে দেখা যায়। সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অনেক অভিভাবক।
এইচএসসি পরীক্ষার্থী উম্মে কুলসুম জানান, পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছাতে নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই বাসা থেকে বের হতে হলেও কলেজে পৌঁছানোর আগেই তার পোশাক সম্পূর্ণ ভিজে যায়। তিনি বলেন, শহরের প্রায় সব সড়কই পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এমনকি কুমিল্লা মহিলা সরকারি কলেজের পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রবেশ করতে নৌকার সহায়তা নিতে হয়েছে।
এদিকে ছেলেকে কুমিল্লা জিলা স্কুলে পৌঁছে দিতে গিয়ে জলাবদ্ধতার মধ্যে একটি ব্যক্তিগত গাড়ি বিকল হয়ে পড়ে। পরে বাবা-ছেলে মিলে গাড়ি ঠেলে নিয়ে যাওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে।
নগরীর ঠাকুরপাড়া এলাকার বাসিন্দা আমির হোসেন জানান, তার বাড়িতে হাঁটুসমান পানি জমেছে। চলতি বর্ষা মৌসুমে এটি তৃতীয়বারের মতো তার ঘরে পানি ঢুকল বলে তিনি জানান।
সবচেয়ে বেশি জলাবদ্ধতা দেখা গেছে জিলা স্কুল সড়ক, পুলিশ লাইনস, রেসকোর্স, চর্থা, ঠাকুরপাড়া, বিসিক শিল্পনগরী, গোবিন্দপুর, মুরাদপুর এবং শহরতলির ছায়াবিতান এলাকায়। বিভিন্ন বাসাবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং নিচু স্থাপনায় পানি ঢুকে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অনেক স্থানে ড্রেন উপচে ময়লা-আবর্জনাযুক্ত পানি সড়কে ছড়িয়ে পড়ায় জনদুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
জলাবদ্ধতার সুযোগে অনেক রিকশা ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালক দ্বিগুণ পর্যন্ত ভাড়া আদায় করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাচ্ছেন সাধারণ যাত্রীরা।
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে নগরীর বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপু এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মামুন। তারা দ্রুত জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন।
কুমিল্লা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সৈয়দ আরিফুর রহমান জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় মোট ১৩৮ দশমিক ২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে সোমবার ভোর থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত মাত্র তিন ঘণ্টায় ১০৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। তিনি আরও জানান, দিনভর ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
কসমিক ডেস্ক