মাজারে দানের টাকা কোথায় যায়—শাহজালাল মাজার ঘিরে নতুন বিতর্ক The Daily Cosmic Post
ঢাকা | বঙ্গাব্দ
ঢাকা |

মাজারে দানের টাকা কোথায় যায়—শাহজালাল মাজার ঘিরে নতুন বিতর্ক

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Jun 24, 2026 ইং
মাজারে দানের টাকা কোথায় যায়—শাহজালাল মাজার ঘিরে নতুন বিতর্ক ছবির ক্যাপশন:

সিলেটের ঐতিহাসিক শাহজালাল (রহ.) মাজারকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে একটি পুরনো প্রশ্ন—মাজারে আসা বিপুল পরিমাণ দানের অর্থ কোথায় যায় এবং কীভাবে তা ব্যয় করা হয়। সম্প্রতি দানবাক্সের অর্থ গণনা এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সংরক্ষণের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে এই বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।

জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে দানবাক্স ও দানের ডেগ খুলে অর্থ গণনা করা হয়। এতে মাত্র চার দিনে প্রায় সাড়ে ১৭ লাখ টাকা, বিদেশি মুদ্রা এবং স্বর্ণালংকার পাওয়া গেছে। এত অল্প সময়ে এত বিপুল অর্থ পাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—বছরে মোট কত টাকা জমা হয় এবং সেই অর্থের ব্যবহার কীভাবে হয়।

জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, মাজারের আয়-ব্যয়ের সুনির্দিষ্ট হিসাব সংরক্ষণে ঘাটতি রয়েছে। এমনকি কিছু ব্যক্তি এই অর্থ নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে ব্যয় করেন বলেও অভিযোগ তোলা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ সরাসরি নাকচ করেছেন মাজারের খাদেমরা।

খাদেমদের দাবি, এই ব্যবস্থাপনা কোনো নতুন কিছু নয়; বরং শতাব্দীপ্রাচীন একটি ঐতিহ্য। তারা জানান, প্রায় সাতশ বছর ধরে বংশ পরম্পরায় তারা মাজারের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তাদের মতে, মাজার কোনো রাষ্ট্রীয় সম্পদ নয় এবং এর ব্যবস্থাপনা ঐতিহ্যগত নিয়মেই পরিচালিত হওয়া উচিত।

তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, মাজারে আসা দান ও মানতের অর্থ বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক কাজে ব্যয় করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে মাজারের রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা, ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজন এবং দরিদ্র মানুষের জন্য লঙ্গরখানায় খাবারের ব্যবস্থা। বিশেষ করে রমজান মাসে গণইফতার এবং বার্ষিক ওরস উপলক্ষে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়।

এছাড়া ইমাম, মুয়াজ্জিন ও কর্মচারীদের বেতন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং অন্যান্য দৈনন্দিন খরচও এই তহবিল থেকেই মেটানো হয়। মাজার প্রাঙ্গণে বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন, যেমন মসজিদ বা নতুন ভবন নির্মাণেও এই অর্থ ব্যবহৃত হয়েছে বলে দাবি করা হয়।

ইতিহাসবিদদের মতে, শাহজালাল (রহ.) সিলেটে আগমনের পর থেকেই স্থানীয় মানুষ দরগায় দান-খয়রাত করে আসছেন। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, এই দান খাদেম পরিবারগুলোর মধ্যে বণ্টন করা হতো। বর্তমানে প্রায় ৩০০ খাদেম পরিবার পালাক্রমে মাজার পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে থাকে। তারা বছরে একদিন দায়িত্ব পায় এবং সেদিনের আয়ের একটি অংশ কেন্দ্রীয়ভাবে জমা দিয়ে বাকিটা নিজেদের জন্য রাখে।

তবে প্রশাসনের দৃষ্টিতে এই ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। তাই নতুন করে আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে এবং জেলা প্রশাসন, ওয়াকফ এস্টেট ও মাজার কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে হিসাব সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বাংলাদেশে মাজার, মসজিদ ও অন্যান্য ধর্মীয় স্থাপনাগুলো সাধারণত ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। এই সম্পত্তির তদারকির জন্য সরকারের ওয়াকফ প্রশাসন রয়েছে। তবে বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবেই এসব প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হয়।

শুধু শাহজালাল মাজার নয়, দেশের অন্যান্য মাজারেও একই ধরনের চিত্র দেখা যায়। কোথাও প্রশাসনের সরাসরি তত্ত্বাবধান থাকে, আবার কোথাও খাদেম ও স্থানীয় কমিটিই সবকিছু পরিচালনা করে। ফলে সার্বিকভাবে মাজারভিত্তিক অর্থ ব্যবস্থাপনায় একটি অভিন্ন কাঠামোর অভাব লক্ষ্য করা যায়।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—এই বিপুল অর্থের ব্যবস্থাপনা কতটা স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক হওয়া উচিত। একদিকে প্রশাসন চাইছে আধুনিক ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা, অন্যদিকে খাদেমরা তাদের ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার রক্ষার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

সব মিলিয়ে, শাহজালাল মাজারকে ঘিরে এই বিতর্ক শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের হিসাব-নিকাশ নয়; বরং এটি দেশের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থ ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিয়ে বৃহত্তর আলোচনার দ্বার খুলে দিয়েছে।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : কসমিক ডেস্ক

কমেন্ট বক্স
প্রতীক হাতে পাচ্ছেন প্রার্থীরা, বৃহস্পতিবার থেকে প্রচারণা

প্রতীক হাতে পাচ্ছেন প্রার্থীরা, বৃহস্পতিবার থেকে প্রচারণা