দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে ধারাবাহিকভাবে একাধিক ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় জনমনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় উৎপত্তিস্থল হওয়ায় বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সর্বশেষ গত ২২ জুন রাত ৮টা ২৮ মিনিটে রাজধানীসহ আশপাশের এলাকায় চার দশমিক চার মাত্রার একটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক গবেষণা সংস্থা ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, এর উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল এবং ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে। অন্যদিকে বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, কম্পনের কেন্দ্র ছিল নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ এলাকায়, যা ঢাকা থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উৎপত্তিস্থল নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার তথ্যে কিছুটা পার্থক্য থাকলেও বাস্তবে ওই অঞ্চলগুলো একই ভূতাত্ত্বিক এলাকার মধ্যে পড়ে। ফলে তথ্যগত পার্থক্য থাকলেও তা ভূমিকম্পের সামগ্রিক মূল্যায়নে বড় প্রভাব ফেলে না।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরু থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বেশ কয়েকটি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার কাছাকাছি এলাকা। এর মধ্যে গাজীপুরের কালিয়াকৈর, নরসিংদীর মাধবদী, পলাশ, ঘোড়াশাল ও শিবপুর উল্লেখযোগ্য।
বিশেষ করে ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর নরসিংদীর মাধবদী এলাকায় উৎপত্তি হওয়া পাঁচ দশমিক সাত মাত্রার ভূমিকম্প সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী কম্পন হিসেবে বিবেচিত হয়। ওই ঘটনায় ঢাকা, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জে প্রাণহানি এবং শত শত মানুষ আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। ভূমিকম্পটির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আরও তিনটি আফটারশক বা পরবর্তী কম্পন অনুভূত হয়েছিল, যার অধিকাংশের উৎপত্তিস্থলও ছিল নরসিংদী ও ঢাকার আশপাশে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. বদরুদ্দোজা মিয়ার মতে, এসব ভূমিকম্প টেকটোনিক প্লেটের স্বাভাবিক নড়াচড়ার ফল হতে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা কোনো ফল্টলাইন পুনরায় সক্রিয় হওয়ার কারণেও এমন ঘটনা ঘটতে পারে।
বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিকভাবে একটি জটিল অঞ্চলে অবস্থিত। দেশের একদিকে রয়েছে ইন্ডিয়ান প্লেট, অন্যদিকে ইউরেশিয়ান প্লেট এবং বার্মিজ প্লেট। এই তিনটি টেকটোনিক প্লেটের পারস্পরিক চাপ ও সংঘর্ষের কারণে বাংলাদেশ ও আশপাশের অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই ভূমিকম্পপ্রবণ।
তবে সাম্প্রতিক কম্পনগুলোকে সরাসরি বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস হিসেবে দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ভূমিকম্প গবেষক অধ্যাপক মেহেদি আহমেদ আনসারী বলেন, ঢাকার আশপাশে হওয়া ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের ভবনধস বা ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা নেই। বরং এসব ঘটনা মানুষকে ভূমিকম্প সম্পর্কে সচেতন হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।
তার মতে, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হলো ঐতিহাসিকভাবে সাত বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প সৃষ্টি করতে সক্ষম ফল্টলাইনগুলো। বিশেষ করে শ্রীমঙ্গল এবং বগুড়ার শেরপুর অঞ্চলে অতীতে শক্তিশালী ভূমিকম্পের রেকর্ড রয়েছে। ১৯১৮ সালে শ্রীমঙ্গলে সাত দশমিক ছয় এবং ১৮৮৫ সালে শেরপুর এলাকায় সাত দশমিক এক মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভবিষ্যতে বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। তবে ঠিক কখন, কোথায় এবং কত মাত্রার ভূমিকম্প হবে, তা বর্তমান প্রযুক্তিতে নিশ্চিতভাবে পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয়।
তাদের মতে, আতঙ্ক নয় বরং প্রস্তুতিই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। ভূমিকম্প সহনশীল ভবন নির্মাণ, পুরোনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংস্কার এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।
কসমিক ডেস্ক