জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে জাতীয় সংসদে একটি বিল পাস করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ‘জুলাইযোদ্ধা’দের জন্য ইনডেমনিটি বা আইনি সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়ে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সোমবার (৩০ মার্চ) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদ সদস্য আখতার হোসেন ও জয়নুল আবদিন ফারুকের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব তথ্য জানান। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাইযোদ্ধাদের সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়টি ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার। এই অঙ্গীকারের ভিত্তিতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ‘জুলাইযোদ্ধা সুরক্ষা অধ্যাদেশ’ জারি করা হয়েছিল। বর্তমানে এই অধ্যাদেশটি অন্যান্য ১৩৩টি অধ্যাদেশের সঙ্গে জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, উপস্থাপিত অধ্যাদেশগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি আগামী ২০ তারিখে বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবে। ইতোমধ্যে সব পক্ষের মধ্যে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে যে ‘জুলাইযোদ্ধা সুরক্ষা অধ্যাদেশ’টি বিল আকারে সংসদে উত্থাপন করে পাস করা হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু গোষ্ঠীর উত্থাপিত বিভিন্ন দাবির প্রসঙ্গ তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গণঅভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে যেসব ব্যক্তি হানাদার বাহিনীর মতো আক্রমণ চালিয়েছে, তারা গুরুতর অপরাধ করেছে। জনতার প্রতিরোধের মুখে সংঘর্ষে কিছু প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে, যা একটি সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির অংশ ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। এই প্রেক্ষাপটে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের সুরক্ষা দিতেই অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, গণঅভ্যুত্থান চলাকালে পুলিশের পোশাক পরে কিংবা অন্য কোনো পরিচয়ে যারা সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে, তারা কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। এদের সবাইকে আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করা হবে। তিনি বলেন, তারা যে পরিচয়েই থাকুক—পুলিশের পোশাক বা কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের পরিচয়ে—অপরাধ করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত মামলার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বিভিন্ন ঘটনায় ইতোমধ্যে একাধিক মামলা দায়ের হয়েছে। কিছু মামলা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে এবং কিছু সাধারণ আইনে বিচারাধীন রয়েছে। এসব মামলার তদন্ত কার্যক্রম চলছে এবং ধাপে ধাপে চার্জশিট দাখিল করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ইতোমধ্যে কয়েকটি মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং এসব বিচার কার্যক্রম টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে, যাতে জনসাধারণ পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবগত থাকতে পারে।
আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সময় লাগতে পারে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে সবার সহযোগিতা কামনা করেন। তিনি বলেন, একটি ন্যায়সঙ্গত বিচার ব্যবস্থার জন্য তদন্ত, সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ এবং আদালতের কার্যক্রম—সবকিছুই নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হয়।
এছাড়া তিনি সংসদ সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলেন, যদি কোনো ঘটনায় এখনো মামলা না হয়ে থাকে, তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মামলা করার আহ্বান জানানো হচ্ছে। প্রতিটি অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হবে এবং বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।
সবশেষে তিনি পুনরায় উল্লেখ করেন, জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে যারা সহিংসতা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল, তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। অপরদিকে, আন্দোলনে অংশ নেওয়া সাধারণ জনগণ ও জুলাইযোদ্ধাদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং সেই লক্ষ্যে সংসদে বিল পাসের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে