দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বাস্তবধর্মী মূল্যায়ন তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, আগামী দুই বছর দেশের জন্য একটি চ্যালেঞ্জিং সময় হতে যাচ্ছে। অর্থনীতিকে স্থিতিশীল অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে সরকারকে যেমন কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তেমনি জনগণকেও ধৈর্য ও সহযোগিতার মানসিকতা নিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সোমবার রাজধানীতে আয়োজিত একটি বাজেট-পরবর্তী আলোচনায় অংশ নিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় দ্রুত সব সমস্যার সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া দায়িত্বশীল হবে না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় ধরে সৃষ্ট বিভিন্ন কাঠামোগত ও আর্থিক চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল ভিত্তিতে ফিরিয়ে আনতে অন্তত দুই বছর সময় প্রয়োজন হবে।
তিনি জানান, সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে সীমিত সম্পদের মধ্যেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখা। এজন্য নীতিনির্ভর সহায়তা, সামাজিক সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে। তবে অর্থনীতির ভেতরে যে চাপ ও দুর্বলতা তৈরি হয়েছে, তা রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অর্থমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, প্রথম দুই বছর পুনর্গঠন ও স্থিতিশীলতার সময় হিসেবে কাজ করবে। এরপর তৃতীয় বছরে অর্থনীতিতে দৃশ্যমান ইতিবাচক পরিবর্তন শুরু হতে পারে। আর চতুর্থ ও পঞ্চম বছরে দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ অবস্থানে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
পুঁজিবাজার নিয়েও তিনি বিস্তারিত বক্তব্য দেন। তাঁর মতে, দীর্ঘদিন ধরে আস্থার সংকটে থাকা পুঁজিবাজারকে পুনরুজ্জীবিত করতে সময় লাগবে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, বাজারের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।
এ লক্ষ্যে একটি স্বাধীন ও পেশাদার কমিশনের মাধ্যমে বিভিন্ন আইন ও নীতিমালার সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান। তাঁর মতে, বাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষিত করা গেলে পুঁজিবাজারে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।
ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ উন্নয়নের প্রসঙ্গেও অর্থমন্ত্রী গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় অনুমোদন, জটিলতা এবং আমলাতান্ত্রিক বাধা কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব সংস্কারের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের জন্য আরও সহজ ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হবে।
ডিরেগুলেশন বা অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ কমানোর বিষয়টিকে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন। এ ধরনের সংস্কার বাস্তবায়নের পথে বাধা আসতে পারে বলেও তিনি স্বীকার করেন। তবে দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে সরকার পিছপা হবে না বলে জানান তিনি।
আয়কর কাঠামো নিয়েও নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, সঞ্চয় ও সম্পদ সৃষ্টির সুযোগ বাড়ানো ছাড়া অর্থনীতির টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। সীমিত আয়ের মানুষের বাস্তবতা বিবেচনায় কর কাঠামো আরও ভারসাম্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের নাগরিকদের জন্য কিছু করসুবিধা বহাল রাখার বিষয়টি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সামগ্রিকভাবে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার কথাও উঠে এসেছে। তিনি মনে করেন, প্রয়োজনীয় সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখা গেলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে সক্ষম হবে।
কসমিক ডেস্ক