বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও প্রযুক্তিগত আধিপত্য ধরে রাখতে শক্তিশালী কোয়ান্টাম কম্পিউটার নির্মাণে গতি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট Donald Trump। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সাইবার হুমকি মোকাবেলায় দেশের সরকারি ডিজিটাল অবকাঠামো আরও সুরক্ষিত করতে নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
স্থানীয় সময় সোমবার দুটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন ট্রাম্প। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র কোয়ান্টাম প্রযুক্তিতে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে চায়। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে চলমান প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে এই পদক্ষেপকে কৌশলগত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
হোয়াইট হাউসের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নীতি কার্যালয়ের পরিচালক মাইকেল ক্রাটসিওস জানিয়েছেন, ২০২৮ সালের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র একটি অত্যাধুনিক কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরির লক্ষ্য অর্জন করতে সক্ষম হবে বলে তারা আশাবাদী। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকারি ও বেসরকারি খাতের যৌথ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
কোয়ান্টাম কম্পিউটার মূলত কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের নীতির ওপর ভিত্তি করে কাজ করে, যা প্রচলিত কম্পিউটারের তুলনায় অনেক বেশি দ্রুত ও দক্ষভাবে জটিল সমস্যা সমাধান করতে পারে। এই প্রযুক্তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রসায়ন, উপাদান বিজ্ঞান এবং প্রতিরক্ষা খাতে বিপ্লব ঘটাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে এর সঙ্গে রয়েছে কিছু ঝুঁকিও। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোয়ান্টাম কম্পিউটার বর্তমান এনক্রিপশন প্রযুক্তি ভেঙে ফেলতে সক্ষম হতে পারে, যা বৈশ্বিক সাইবার নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় ট্রাম্প প্রশাসন ‘পোস্ট-কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফি’ ব্যবস্থায় রূপান্তরের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ২০৩০ বা ২০৩১ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কম্পিউটার সিস্টেমগুলোকে এই উন্নত নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় আনা হবে। এর ফলে ভবিষ্যতে কোয়ান্টাম প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিচালিত সাইবার হামলা প্রতিরোধ করা সহজ হবে।
এছাড়া প্রতিরক্ষা খাতেও কোয়ান্টাম প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ২০২৮ সালের মধ্যে পেন্টাগনকে কোয়ান্টাম সেন্সর মোতায়েনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব সেন্সর যুদ্ধক্ষেত্রে জিপিএস ব্যবস্থা ব্যাহত হলে বিকল্প নেভিগেশন সহায়তা দিতে পারবে।
শুধু তাই নয়, এই সেন্সরগুলো স্যাটেলাইটে স্থাপন করা হলে মহাকাশ থেকেই ভূগর্ভস্থ কার্যক্রম—যেমন টানেল বা ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি নির্মাণ—শনাক্ত করা সম্ভব হবে। ফলে প্রতিরক্ষা নজরদারি আরও উন্নত হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কোয়ান্টাম প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের আগেই কোয়ান্টাম সেন্সিং প্রযুক্তি বাস্তব ক্ষেত্রে দ্রুত সুবিধা দিতে পারে। এই খাতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই অগ্রগতি অর্জন সম্ভব বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগ কোয়ান্টাম কম্পিউটিং খাতে নয়টি প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। এর মধ্যে প্রযুক্তি জায়ান্ট IBM-এর একটি নতুন উদ্যোগও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই বিনিয়োগ গবেষণা ও উন্নয়নে গতি আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এছাড়া আরেকটি নির্বাহী আদেশে মেধাস্বত্ব সুরক্ষা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের নিরাপত্তা জোরদারে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হোয়াইট হাউসের মতে, প্রতিদ্বন্দ্বী ও বৈরী দেশগুলোর সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ মোকাবিলায় এই পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি।
নির্দেশনাগুলোর আওতায় আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বিভিন্ন সরকারি সংস্থাকে কোয়ান্টামভিত্তিক সেন্সর ও নেটওয়ার্ক ব্যবহারের জন্য বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রণয়নের কথাও বলা হয়েছে। সব মিলিয়ে, কোয়ান্টাম প্রযুক্তিতে আধিপত্য ধরে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র এখন আরও দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
কসমিক ডেস্ক