মিজানুর রহমান আজহারি সম্প্রতি তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে “ইসলামে সম্প্রীতির অনন্য বার্তা” শিরোনামে একটি আলোচনার ভিডিও শেয়ার করেন। ওই আলোচনায় তিনি বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী ধর্মীয় সহাবস্থান, সামাজিক সম্প্রীতি এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ একটি বহু ধর্ম ও বহু সংস্কৃতির দেশ, যেখানে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, পাহাড়ি ও নৃগোষ্ঠীর মানুষ একসঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করছে। তার মতে, এই সহাবস্থানই বাংলাদেশের প্রকৃত শক্তি। তিনি উল্লেখ করেন, পারস্পরিক ভালোবাসা, সৌহার্দ্য এবং বোঝাপড়ার মাধ্যমে সমাজে দীর্ঘদিন ধরে একটি স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কখনো কখনো কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী এই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নষ্ট করার চেষ্টা করে। তবে এসব অপচেষ্টা সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে বিভ্রান্ত করতে পারে না, বরং সবাইকে আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
আলোচনায় তিনি বাংলাদেশের ধর্মীয় সহাবস্থানের বাস্তব উদাহরণও তুলে ধরেন। যেমন, বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় উৎসবের সময় পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সহনশীল আচরণ। তিনি উল্লেখ করেন, অনেক সময় দেখা যায় হিন্দু সম্প্রদায়ের পূজার সময় ইসলামিক তাফসির বা মাহফিলের আয়োজন এড়িয়ে চলা হয়, আবার মুসলিমদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সময় অন্য ধর্মাবলম্বীরাও কোনো বিঘ্ন ঘটায় না। এমনকি বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় সাধারণ মানুষের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরাও সহায়তা করে থাকে, যা বিশ্বে বিরল উদাহরণ।
তিনি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে বলেন, ধর্মীয় সহাবস্থান এবং অন্য ধর্মকে সম্মান করা ইসলামের মৌলিক শিক্ষা। কোনো ধর্মকে অবমাননা করা বা ছোট করা ইসলামের নীতির পরিপন্থী। এতে সমাজে বিদ্বেষ সৃষ্টি হয় এবং ইসলামের সৌন্দর্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এ প্রসঙ্গে তিনি পবিত্র কোরআনের নির্দেশনার কথা উল্লেখ করেন, যেখানে বলা হয়েছে, অন্য ধর্মের উপাস্যদের গালি দিতে নিষেধ করা হয়েছে, যাতে প্রতিক্রিয়ায় আরও বড় ধরনের বিদ্বেষ সৃষ্টি না হয়। এটি ইসলামের সহনশীলতা ও শান্তির বার্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আলোচনায় তিনি আরও বলেন, ইসলামের ইতিহাসে শান্তি ও সহাবস্থানের বহু উদাহরণ রয়েছে। Prophet Muhammad মদিনায় হিজরতের পর মদিনা সনদ প্রণয়ন করেন, যেখানে বিভিন্ন ধর্ম ও গোত্রের মানুষকে নিয়ে একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। এছাড়া মক্কার কুরাইশদের সঙ্গে হুদাইবিয়ার সন্ধিও ছিল শান্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
তিনি সংখ্যালঘুদের অধিকার প্রসঙ্গে বলেন, ইসলামে সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়েছে। কোনো সংখ্যালঘুর ওপর জুলুম করা, তাদের সম্পদ হরণ করা বা অধিকার নষ্ট করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। তিনি বলেন, বিচার দিবসে নবী করিম (সা.) এমন নির্যাতনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবেন—এটি ইসলামের ন্যায়বিচারের একটি শক্তিশালী বার্তা।
তিনি আরও বলেন, একজন মুসলিমের দায়িত্ব শুধু নামাজ-রোজা পালন নয়, বরং প্রতিবেশীর প্রতি সদাচরণ করা। প্রতিবেশী যদি ভিন্ন ধর্মেরও হয়, তবুও তার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতে হবে, অসুস্থ হলে খোঁজ নেওয়া এবং মানবিক সম্পর্ক বজায় রাখা ইসলামের শিক্ষা।
এছাড়া তিনি উল্লেখ করেন, ইসলামে অমুসলিম মা-বাবার প্রতিও সদাচরণের নির্দেশ রয়েছে। ধর্মান্তরিত হওয়ার পরও পরিবারিক সম্পর্ক ছিন্ন করার অনুমতি নেই। বরং পারিবারিক বন্ধন এবং মানবিক দায়িত্ব বজায় রাখাই ইসলামের আদর্শ।
সবশেষে তিনি বলেন, ইসলাম সংকীর্ণ কোনো ধর্ম নয়, বরং এটি উদারতা, মানবতা এবং ভালোবাসার ধর্ম। অমুসলিমদের সঙ্গে লেনদেন, উপহার গ্রহণ এবং সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখার অসংখ্য দৃষ্টান্ত ইসলামের ইতিহাসে রয়েছে। তাই ঘৃণা নয়, ভালোবাসা ও সম্প্রীতির মাধ্যমে সমাজকে এগিয়ে নেওয়াই প্রকৃত ইসলামী শিক্ষা।