ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশেষ সামরিক বিমানের উড্ডয়ন। ‘ডুমসডে প্লেন’ নামে পরিচিত এই বিমানটি সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন আকাশে দেখা যাওয়ায় সম্ভাব্য বৃহৎ সামরিক সংঘাত নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে।
সোমবার (৬ এপ্রিল) যুক্তরাষ্ট্রের নেব্রাস্কা অঙ্গরাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটির আকাশে বোয়িং ই-৪বি নাইটওয়াচ বিমানটিকে চক্কর দিতে দেখা যায়। ফ্লাইট ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, বিমানটি অফুট এয়ার ফোর্স বেস থেকে উড্ডয়ন করে আশপাশের এলাকায় অন্তত ছয়বার চক্কর দিয়ে পুনরায় অবতরণ করে। এই অস্বাভাবিক গতিবিধি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের বিমানের উড্ডয়ন সাধারণত কোনো উচ্চ পর্যায়ের সামরিক প্রস্তুতি বা মহড়ার ইঙ্গিত বহন করে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি আরও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে, কারণ ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক এখন অত্যন্ত সংবেদনশীল অবস্থায় রয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইরানকে একটি শান্তিচুক্তির প্রস্তাব দিয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন। সেই সময়সীমা শেষ হওয়ার ঠিক আগে এই বিশেষ বিমানের উড্ডয়নকে ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি কেবল নিয়মিত মহড়া, নাকি সম্ভাব্য বড় কোনো সামরিক পদক্ষেপের পূর্বাভাস?
‘ডুমসডে প্লেন’ বা বোয়িং ই-৪বি নাইটওয়াচকে অনেক সময় ‘উড়ন্ত পেন্টাগন’ বলা হয়। এই বিমানটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে পারমাণবিক যুদ্ধ বা বড় ধরনের জাতীয় সংকটের সময়েও সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতৃত্ব নিরাপদ থেকে দেশ পরিচালনা করতে পারে। এতে প্রেসিডেন্ট, প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা অবস্থান করে সরাসরি কমান্ড ও কন্ট্রোল পরিচালনা করতে পারেন।
বিমানটির প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও অত্যন্ত উন্নত। এটি পারমাণবিক বিস্ফোরণের ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক পালস (EMP), সাইবার হামলা এবং বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রনিক ব্যাঘাত প্রতিরোধ করতে সক্ষম। এর ভেতরে রয়েছে তিনটি ডেক, ১৮টি বাঙ্ক, একটি পূর্ণাঙ্গ কমান্ড সেন্টার, কনফারেন্স রুম এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। বিমানের ওপর স্থাপিত বহু স্যাটেলাইট ডিশ ও অ্যান্টেনার মাধ্যমে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ রাখা সম্ভব।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এ ধরনের চারটি বিমান রয়েছে, যা সারাবছরই প্রস্তুত অবস্থায় রাখা হয় এবং নিয়মিত মহড়া পরিচালনা করা হয়। তবে চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে এই উড্ডয়নকে অনেকেই ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, হরমুজ প্রণালি ইস্যু, মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সংঘাত এবং পারমাণবিক হুমকির প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা সক্রিয় রাখছে। ইরান যদি যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত শর্ত মানতে ব্যর্থ হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প কঠোর ভাষায় সতর্ক করে বলেছেন, প্রয়োজনে একটি পুরো দেশকে এক রাতেই ধ্বংস করে দেওয়া সম্ভব। তার এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
সব মিলিয়ে, ‘ডুমসডে প্লেন’-এর উপস্থিতি শুধু একটি সামরিক মহড়ার বিষয় নয়, বরং এটি বর্তমান বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবেই দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কা এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে সংঘাতের সম্ভাবনা মাথায় রেখে বিশ্ব এখন পরিস্থিতির দিকে গভীর নজর রাখছে।
কসমিক ডেস্ক