মৌলভীবাজারের শমশেরনগর চা বাগান এলাকায় অবস্থিত ক্যামেলিয়া ডানকান ফাউন্ডেশন হাসপাতাল টানা ১৬ দিন ধরে বন্ধ থাকায় চরম স্বাস্থ্য সংকটে পড়েছেন চা শ্রমিক ও তাদের পরিবার। স্থানীয় চা শ্রমিক নেতাদের দাবি, এই সময়ের মধ্যে চিকিৎসাসেবা না পেয়ে অন্তত পাঁচজন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে, যা পুরো এলাকায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গত ২৬ মার্চ ঐশী রবিদাস নামে সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী মাথাব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। রাতে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেন। তবে পরিবারের সদস্যরা রাতেই স্থানান্তরে সম্মতি না দেওয়ায় পরদিন সকালে হাসপাতালেই তার মৃত্যু ঘটে।
এই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে চা শ্রমিকদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে স্থানীয় এক নেতার নেতৃত্বে একদল ব্যক্তি হাসপাতালে হামলা চালায়। হামলাকারীরা হাসপাতালের বিভিন্ন স্থাপনায় ভাঙচুর করে এবং সেখানে কর্মরত চিকিৎসকদের হেনস্তা করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ হস্তক্ষেপ করলেও নিরাপত্তাহীনতার কারণে চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা হাসপাতাল ত্যাগ করেন। এরপর থেকেই হাসপাতালটির সব ধরনের চিকিৎসাসেবা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই হাসপাতালটি ছিল শমশেরনগরসহ আশপাশের চা বাগানের শ্রমিকদের জন্য একমাত্র নির্ভরযোগ্য চিকিৎসাকেন্দ্র। নব্বইয়ের দশকে যুক্তরাজ্যভিত্তিক ক্যামেলিয়া ডানকান ফাউন্ডেশন এটি প্রতিষ্ঠা করে। এখানে চা শ্রমিক, তাদের পরিবার এবং বাগানের কর্মকর্তারা নিয়মিত চিকিৎসাসেবা পেতেন। জরুরি প্রয়োজনে আশপাশের সাধারণ মানুষও এই হাসপাতালের ওপর নির্ভর করতেন।
বর্তমানে হাসপাতালটি বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন চা শ্রমিক পরিবারগুলো। বিশেষ করে নারী শ্রমিকরা জানিয়েছেন, এই হাসপাতালই ছিল তাদের প্রধান ভরসা। কোনো অভিযোগ থাকলে তা তদন্তের মাধ্যমে সমাধান করা যেত, কিন্তু পুরো হাসপাতাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শ্রমিকরা চিকিৎসাসেবা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হচ্ছেন।
এদিকে, একই ফাউন্ডেশনের অধীনে পরিচালিত লংলা এলাকার ক্যামেলিয়া স্কুলের কার্যক্রম নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ফলে স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি শিক্ষা খাতেও সংকট তৈরি হয়েছে, যা চা শ্রমিক পরিবারের শিশুদের ভবিষ্যতের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
ঘটনার পর তিন দিন পেরিয়ে ২৯ মার্চ শমশেরনগর চা বাগানে একটি জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও হাসপাতাল পুনরায় চালুর বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যে অবস্থিত ফাউন্ডেশনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের নির্দেশনা ছাড়া হাসপাতালের কার্যক্রম পুনরায় চালু করা সম্ভব নয়। ইতোমধ্যে ঘটনাটির তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে বলেও জানা গেছে।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরী বলেন, ঐশীর মৃত্যুতে সবাই শোকাহত। তবে এ ধরনের ঘটনায় সহিংসতা না করে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল। তিনি দ্রুত হাসপাতালটি চালুর দাবি জানান, যাতে শ্রমিকরা আবারও চিকিৎসাসেবা পেতে পারেন।
অন্যদিকে, শমশেরনগর চা বাগানের ব্যবস্থাপক ও ডানকান ব্রাদার্সের উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. কামরুজ্জামান জানিয়েছেন, হাসপাতালটি একটি স্বতন্ত্র ফাউন্ডেশনের অধীনে পরিচালিত হওয়ায় তাদের সরাসরি হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। তবে শ্রমিকদের দুর্ভোগের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, চা শ্রমিক নেতারা তার সঙ্গে দেখা করে হাসপাতালটি দ্রুত চালুর দাবি জানিয়েছেন। তিনি বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন এবং আশা প্রকাশ করেছেন, দ্রুতই হাসপাতালটি খুলে দেওয়া হবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে হাসপাতালটি দ্রুত চালু না হলে চা শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। স্থানীয়রা বলছেন, চিকিৎসাসেবা একটি মৌলিক অধিকার, তাই যেকোনো পরিস্থিতিতেই এই সেবা চালু রাখা জরুরি।