লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার ধবলগুড়ি সীমান্তে গুলিতে নিহত এক বাংলাদেশির মরদেহ অবশেষে দেশে ফিরিয়ে দিয়েছে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ)। নিহত ব্যক্তির নাম আলী হোসেন (৪১)। ঘটনার প্রায় ১৭ ঘণ্টা পর বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে তার মরদেহ বাংলাদেশে হস্তান্তর করা হয়।
মরদেহ হস্তান্তরের সময় উপস্থিত ছিলেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), বিএসএফ এবং দুই দেশের পুলিশ সদস্যরা। জানা গেছে, ভারতীয় পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে মরদেহটি বাংলাদেশ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। এর আগে সীমান্ত এলাকায় উভয় দেশের বাহিনীর মধ্যে একটি পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়।
বিজিবি সূত্র জানায়, ধবলগুড়ি সীমান্তের ৮৭৫ নম্বর পিলারের ১ নম্বর সাব-পিলারের পাশে প্রায় ২০ মিনিট ধরে এই পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বিজিবির ১০ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন ৬১ বিজিবি তিস্তা ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সৈয়দ ফজলে মুনীম। অন্যদিকে বিএসএফের ২০ সদস্যের দলের নেতৃত্ব দেন ফালাকাটা সেক্টরের ১৫৬ ব্যাটালিয়নের কমান্ড্যান্ট সৌরভ।
এই বৈঠকে বিজিবি পক্ষ থেকে সীমান্তে গুলি করে বাংলাদেশি নাগরিক হত্যার ঘটনায় তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়। তারা এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটানোর জন্যও কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করে। জবাবে বিএসএফ এই ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে এবং এটিকে একটি ‘অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ করে।
বিএসএফের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, কয়েকজন বাংলাদেশি অবৈধভাবে ভারতের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে এবং চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই ব্যক্তিরা বিএসএফ সদস্যদের ওপর আক্রমণ চালালে আত্মরক্ষার্থে গুলি ছোড়া হয়। এতে আলী হোসেন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বুধবার ভোররাত প্রায় ৪টার দিকে ৭ থেকে ৮ জনের একটি দল সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের ভেতরে প্রবেশ করে। তারা গরু আনতে কাঁটাতারের বেড়ার কাছে অবস্থান করছিলেন। এ সময় টহলরত বিএসএফ সদস্যরা তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। গুলিতে আলী হোসেন ঘটনাস্থলেই পড়ে যান, আর বাকিরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।
পরে বিএসএফ সদস্যরা গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। দীর্ঘ সময় পর প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে তার মরদেহ ফেরত দেওয়া হয়।
নিহত আলী হোসেন পাটগ্রাম উপজেলার ধবলগুড়ি পূর্ব পানিয়ারটারী গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। তার বড় ভাই আব্দুল মালেক জানান, আলী হোসেন মূলত কৃষিকাজ করতেন। তবে অন্যদের প্ররোচনায় পড়ে তিনি ওইদিন সীমান্তে গিয়েছিলেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, যারা নিয়মিত এসব কাজে জড়িত, তারা পালিয়ে এলেও তার ভাই প্রাণ হারিয়েছেন।
মরদেহ গ্রহণের পর সেটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং রাতেই স্থানীয় কবরস্থানে দাফনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। এ বিষয়ে পাটগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
এই ঘটনা আবারও সীমান্তে নিরাপত্তা ও মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। প্রায়ই সীমান্ত এলাকায় এ ধরনের গুলির ঘটনা ঘটছে, যা দুই দেশের সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে উভয় দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে আরও সমন্বয় ও সংযম প্রয়োজন।
কসমিক ডেস্ক