রাজধানীর পূর্বাচল সংযোগ সড়ক হিসেবে পরিচিত ৩০০ ফিট এক্সপ্রেসওয়ে বর্তমানে একটি ঝুঁকিপূর্ণ সড়কে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। উন্নত অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও যথাযথ নিয়ন্ত্রণের অভাব এবং ব্যবহারকারীদের অসচেতনতা এ সড়কটিকে কার্যত ‘ডেথ ট্র্যাক’-এ রূপ দিয়েছে।
সাম্প্রতিক এক ঘটনায় সকালবেলা ব্যস্ত সময়ে একটি প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি অটোরিকশাকে ধাক্কা দেয়। এতে অটোরিকশার এক যাত্রী নিহত হন এবং চালক গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। দুর্ঘটনার পর গাড়ির চালক ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান।
এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। স্থানীয়দের মতে, প্রায় প্রতিদিনই সড়কটির কোথাও না কোথাও দুর্ঘটনা ঘটছে। কখনো ঘটনাস্থলেই প্রাণহানি হচ্ছে, আবার কখনো আহতদের মধ্যে কেউ চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্বের শিকারও হচ্ছেন ভুক্তভোগীরা।
অতিরিক্ত গতি এই সড়কের অন্যতম প্রধান ঝুঁকির কারণ। আইনে নির্ধারিত গতিসীমা থাকলেও বাস্তবে তা মানার প্রবণতা খুবই কম। অনেক চালক ১২০ থেকে ১৩০ কিলোমিটার গতিতে গাড়ি চালাচ্ছেন, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণে বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এছাড়া নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও সার্ভিস রোডে অটোরিকশা চলাচল করছে, এমনকি অনেক সময় উল্টো পথে চলাচল করতেও দেখা যায়। ফলে সড়কের স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং দুর্ঘটনার সম্ভাবনা আরও বাড়ছে।
পথচারীদের জন্যও এই সড়কটি নিরাপদ নয়। প্রয়োজনীয় সংখ্যক ফুটওভার ব্রিজ না থাকায় অনেকেই ঝুঁকি নিয়ে সরাসরি সড়ক পার হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, যেখানে মানুষ বেশি পারাপার করে, সেখানে ফুটওভার ব্রিজ নেই বা দূরে অবস্থিত। ফলে মানুষ বাধ্য হয়ে দ্রুতগতির গাড়ির মাঝ দিয়েই রাস্তা পার হচ্ছেন।
ট্রাফিক পুলিশের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় চেকপোস্ট বসানো হলেও কার্যকর নজরদারির অভাব রয়েছে। স্পিডগান বা স্বয়ংক্রিয় গতিনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকায় অতিরিক্ত গতির গাড়িগুলো সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।
দিনের তুলনায় রাতের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। সন্ধ্যার পর এই সড়কটি অনেকের কাছে বিনোদনের জায়গায় পরিণত হয়। কেউ ঘুরতে আসে, কেউ ভিডিও তৈরি করে, আবার কেউ দলবেঁধে আড্ডা দেয়। গভীর রাতে এটি প্রায় রেসিং ট্র্যাকের মতো হয়ে যায়, যেখানে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকারের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক গতি দেখা যায়।
স্থানীয়দের মতে, এসব কর্মকাণ্ডের ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যায়। অনেক সময় স্টান্ট করতে গিয়ে বা অতিরিক্ত গতিতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে।
দুর্ঘটনা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দ্রুত কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে অটোরিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণ, স্বয়ংক্রিয় স্পিড ক্যামেরা স্থাপন, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং যানবাহনে স্পিড গভর্নর নিশ্চিত করা।
পাশাপাশি যেসব স্থানে পথচারীদের চলাচল বেশি, সেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করাও জরুরি বলে তারা মত দেন।
সব মিলিয়ে, উন্নত সড়ক অবকাঠামো থাকলেও সঠিক ব্যবস্থাপনা, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং জনসচেতনতার অভাবে ৩০০ ফিট এক্সপ্রেসওয়ে এখন একটি মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ সড়কে পরিণত হয়েছে। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে দুর্ঘটনার সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।