উত্তরবঙ্গের কৃষি উন্নয়নের লক্ষ্যে গৃহীত গভীর নলকূপ প্রকল্পে যুক্ত হয়ে গ্রামীণ ব্যাংকের বিরুদ্ধে চুক্তিভঙ্গ ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৭ সালে বৃহত্তর রংপুর ও দিনাজপুর অঞ্চলের কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশ সরকার ও সৌদি উন্নয়ন তহবিলের সহায়তায় ২০০০ গভীর নলকূপ স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
এই প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার পেছনে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তার উদ্যোগে কৃষি উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় উত্তরবঙ্গে। এই সময়েই গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রকল্পটিকে তার প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বিস্তারের সুযোগ হিসেবে দেখেন। যদিও সেচ কার্যক্রমে গ্রামীণ ব্যাংকের পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না, তবুও তারা এতে যুক্ত হওয়ার উদ্যোগ নেয়।
পরবর্তীতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) ১৫০০ গভীর নলকূপ গ্রামীণ ব্যাংকের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করে। ১৯৮৮ সালের চুক্তি অনুযায়ী প্রতিটি নলকূপের মূল্য নির্ধারণ করা হয় ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, যার মোট মূল্য দাঁড়ায় ২৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা। তবে গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিটি নলকূপের বিপরীতে মাত্র ৬ হাজার ৫০০ টাকা ডাউন পেমেন্ট দিয়ে মোট ৯৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা পরিশোধ করে।
চুক্তি অনুযায়ী ১৫০০ নলকূপ নেওয়ার কথা থাকলেও গ্রামীণ ব্যাংক শেষ পর্যন্ত মাত্র ৫৭৩টি নলকূপ গ্রহণ করে এবং ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের আগে তারা প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়ায়। এর ফলে উত্তরবঙ্গের সেচ কার্যক্রমে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়।
পরবর্তীতে কৃষি মন্ত্রণালয় একাধিকবার বকেয়া ৯ কোটি ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা পরিশোধের জন্য তাগিদ দিলেও গ্রামীণ ব্যাংক তা পরিশোধ করেনি। এ কারণে ২০১১ সালে বিএডিসি তাদের বিরুদ্ধে মামলা করে এবং দীর্ঘ শুনানি শেষে আদালত বিএডিসির পক্ষে রায় দেয়। তবে গ্রামীণ ব্যাংক সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে, যা এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
এদিকে প্রযুক্তিগত দক্ষতার অভাবের কারণে গ্রামীণ ব্যাংকের পক্ষে নলকূপগুলো সঠিকভাবে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। ফলে অনেক নলকূপ অচল হয়ে পড়ে এবং পরবর্তীতে সরকারের নির্দেশে বেশ কিছু নলকূপ বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)-এর অধীনে হস্তান্তর করা হয়।
সাম্প্রতিক এক ত্রিপক্ষীয় জরিপে দেখা গেছে, ৫৭৩টি নলকূপের মধ্যে বর্তমানে বিএডিসির আওতায় রয়েছে ৪১টি, বিএমডিএ পরিচালনা করছে ৩৫৩টি এবং গ্রামীণ ব্যাংকের আওতায় রয়েছে ১৭৯টি নলকূপ।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে একটি বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, গ্রামীণ ব্যাংক তাদের আওতায় থাকা ১৭৯টি নলকূপের জন্য নির্ধারিত মূল্যে অর্থ পরিশোধ করবে। তবে পূর্বে দেওয়া ডাউন পেমেন্ট সমন্বয় করে তাদের পরিশোধযোগ্য অর্থ নির্ধারণ করা হয় প্রায় ২ কোটি ১৫ লাখ টাকা।
তবে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্ত সরকারের আর্থিক স্বার্থ পুরোপুরি রক্ষা করেনি। আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী, নির্ধারিত সংখ্যক নলকূপ না নিলে ডাউন পেমেন্ট বাতিল হওয়া এবং ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা ছিল। পাশাপাশি দীর্ঘ ২২ বছর নলকূপ পরিচালনা করে অর্জিত আয় ও অবচয়জনিত ক্ষতিও বিবেচনায় নেওয়া উচিত ছিল।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পুরো বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। তাদের মতে, একটি স্বাধীন কমিটির মাধ্যমে প্রকল্পের আর্থিক ও প্রশাসনিক দিকগুলো পুনর্মূল্যায়ন করা হলে প্রকৃত দায় নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
কসমিক ডেস্ক