বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলায় সালিশ বৈঠক চলাকালে সংঘটিত হামলায় খোরশেদ সিকদার নামে এক ট্যানারি শ্রমিক নিহত হয়েছেন। রোববার (২২ মার্চ) বিকেল ৪টার দিকে পৌরসভার দক্ষিণ চরহোগলা এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। নিহত খোরশেদ সিকদার (৫৫) ওই এলাকার বাসিন্দা ছিলেন এবং ঢাকার হাজারীবাগ এলাকার একটি ট্যানারিতে কাজ করতেন বলে জানা গেছে।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই দশক আগের একটি আর্থিক লেনদেন নিয়ে বিরোধের জের ধরে এ ঘটনার সূত্রপাত। অভিযোগ রয়েছে, বিল্ডিংয়ের সেন্টারিং মালামাল বাবদ খোরশেদ সিকদারের কাছে ২ লাখ ৫২ হাজার টাকা পাওনা রয়েছে দাবি করে জাহাঙ্গীর হাওলাদার নামের এক ব্যক্তি থানায় অভিযোগ দেন। এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে রোববার উভয় পক্ষকে নিয়ে সালিশ বৈঠকের আয়োজন করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী তোতা সিকদার জানান, থানার উপপরিদর্শক নাজমুল ইসলামের উপস্থিতিতে দুই পক্ষ শালিসে বসেন। বৈঠক চলাকালে খোরশেদ সিকদারের পক্ষ থেকে ভিডিও ধারণ করা নিয়ে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, এই সংঘর্ষেই খোরশেদ সিকদার গুরুতরভাবে আহত হন এবং ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
ঘটনার পর নিহতের স্বজনরা সরাসরি হামলার অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় এক বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে। নিহতের ভাতিজা রাকিব সিকদার বলেন, তার চাচাকে জাহাঙ্গীর হাওলাদারের নেতৃত্বে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, পুলিশের সামনেই এই হামলার ঘটনা ঘটেছে। পরিবারের পক্ষ থেকে এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, হামলার নেতৃত্ব দিয়েছেন ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর হাওলাদার। তবে ঘটনার পর তিনি পালিয়ে যাওয়ায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগের বিষয়ে তার প্রতিক্রিয়া জানা সম্ভব হয়নি।
এদিকে ঘটনার পর দলীয় অবস্থান স্পষ্ট করেছেন স্থানীয় বিএনপি নেতারা। পৌর বিএনপির সদস্য সচিব রিয়াজ উদ্দিন চৌধুরী, যিনি দিনু মিয়া নামেও পরিচিত, বলেন, মারামারির খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জাহাঙ্গীর আলমকে দল থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। তিনি বলেন, বিএনপি কোনো ধরনের অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয় না এবং খুব দ্রুত এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।
পুলিশও ঘটনাটিকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। মেহেন্দিগঞ্জ থানার পরিদর্শক মো. মতিউর রহমান জানিয়েছেন, ঘটনার তদন্ত চলছে এবং অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তিনি বিস্তারিত কিছু না জানালেও বলেন, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে আছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। একটি সালিশ বৈঠক, যেখানে মূলত বিরোধ মীমাংসার কথা, সেটি কীভাবে সহিংস সংঘর্ষে গড়াল এবং একজন মানুষের প্রাণহানির কারণ হলো—এ নিয়ে এলাকাজুড়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে পুলিশের উপস্থিতিতে এমন ঘটনা ঘটার অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাব, ব্যক্তিগত বিরোধ এবং সালিশ ব্যবস্থার অনিয়ন্ত্রিত চর্চা মিলিয়ে অনেক সময় পরিস্থিতি সহিংস রূপ নেয়। এই ঘটনাও তেমন একটি উদাহরণ হয়ে সামনে এলো, যেখানে পুরোনো আর্থিক বিরোধ মীমাংসার বদলে প্রাণহানির মতো মর্মান্তিক পরিণতি ঘটেছে।
সব মিলিয়ে, দক্ষিণ চরহোগলার এই ঘটনা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়, বরং স্থানীয় বিরোধ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়ার নিরাপত্তা ও নিরপেক্ষতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। এখন দেখার বিষয়, তদন্তে প্রকৃত ঘটনা কত দ্রুত উঠে আসে এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কী ধরনের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
কসমিক ডেস্ক