ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ নিয়েছে। দেশটি প্রতি বুধবার সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে, ফলে এখন সেখানে সাপ্তাহিক ছুটি দাঁড়িয়েছে তিন দিন।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য জ্বালানি সংকট মোকাবিলার প্রস্তুতি হিসেবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে শ্রীলঙ্কা সরকার। সোমবার (১৬ মার্চ) অনুষ্ঠিত এক জরুরি বৈঠকে দেশটির প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিশানায়েক বলেন, সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে, যদিও তারা ভালো কিছুর প্রত্যাশা করছেন।
এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল সরবরাহে বিঘ্ন। পারস্য উপসাগর থেকে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বিপুল পরিমাণ তেল এই প্রণালী দিয়ে আসে। সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে এশিয়ার দেশগুলো জ্বালানি সাশ্রয়ে বাধ্য হচ্ছে।
গত বছর এই প্রণালী দিয়ে প্রবাহিত মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় ৯০ শতাংশই এশিয়ার দিকে গিয়েছিল, যা অঞ্চলটিকে বিশ্বে সবচেয়ে বড় জ্বালানি আমদানিকারক হিসেবে চিহ্নিত করে। ফলে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে এর প্রভাব সরাসরি এশিয়ার দেশগুলোতে পড়ে।
শ্রীলঙ্কার নতুন এই চার কর্মদিবসের নিয়ম শুধু সরকারি অফিসেই নয়, স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়েও প্রযোজ্য হবে। তবে স্বাস্থ্যসেবা, ইমিগ্রেশনসহ জরুরি পরিষেবাগুলো এই ছুটির আওতার বাইরে থাকবে। সরকার জানিয়েছে, শুক্রবারের পরিবর্তে বুধবারকে ছুটি হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে যাতে টানা তিন দিন অফিস বন্ধ না থাকে।
জ্বালানি সাশ্রয়ের অংশ হিসেবে শ্রীলঙ্কায় ‘ন্যাশনাল ফুয়েল পাস’ ব্যবস্থাও চালু রয়েছে। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট কোটা অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে। ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য ১৫ লিটার এবং মোটরসাইকেলের জন্য ৫ লিটার নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও এই সীমাবদ্ধতা নিয়ে জনগণের মধ্যে কিছু অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
এই রেশনিং ব্যবস্থা নতুন নয়। ২০২২ সালে দেশের তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের সময়ও এটি চালু করা হয়েছিল, যখন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ফুরিয়ে যাওয়ায় শ্রীলঙ্কা প্রয়োজনীয় জ্বালানি আমদানি করতে পারেনি।
শুধু শ্রীলঙ্কাই নয়, এশিয়ার অন্যান্য দেশও জ্বালানি সাশ্রয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। থাইল্যান্ডে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার কমাতে জনগণকে আনুষ্ঠানিক পোশাকের পরিবর্তে হালকা পোশাক পরার আহ্বান জানানো হয়েছে।
মিয়ানমারে ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচলে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে, যেখানে লাইসেন্স নম্বর অনুযায়ী একদিন পরপর গাড়ি চালানোর অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশেও জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রমজানের ছুটি এগিয়ে আনা হয়েছে এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য পরিকল্পিত লোডশেডিং বা ব্ল্যাকআউট চালু করা হয়েছে।
ফিলিপাইনে সরকারি কর্মীদের সপ্তাহে অন্তত একদিন বাসা থেকে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় সরকারি ভ্রমণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অন্যদিকে ভিয়েতনামে নাগরিকদের ঘরে থাকার এবং গণপরিবহন ব্যবহারে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
এদিকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে প্রায় ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। ফলে জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে চাপ আরও বাড়ছে।
সার্বিকভাবে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারেও বড় প্রভাব ফেলছে। শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলো ইতোমধ্যে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে, যা ভবিষ্যতে অন্যান্য দেশেও অনুসরণ করা হতে পারে।
কসমিক ডেস্ক