মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনার আহ্বান জানিয়েছে ইরান। সৌদি আরবে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আলিরেজা এনায়াতি বলেছেন, এই অঞ্চলের দেশগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন, যাতে বাইরের শক্তিগুলো এ অঞ্চলে অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার করতে না পারে।
গতকাল রোববার বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রদূত আলিরেজা এনায়াতি বলেন, এটি একটি যৌক্তিক প্রশ্ন।
তার ভাষায়, এই অঞ্চলের দেশগুলো একে অপরের প্রতিবেশী এবং তারা একে অপরকে ছাড়া চলতে পারে না। তাই পারস্পরিক সম্পর্ক গুরুত্ব দিয়ে পুনর্মূল্যায়ন করা দরকার।
তিনি বলেন, গত পাঁচ দশকে এই অঞ্চলে যে অনেক ঘটনা ঘটেছে, তার পেছনে বহির্মুখী দৃষ্টিভঙ্গি এবং বাইরের শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা একটি বড় কারণ। তার মতে, এই বাস্তবতার কারণে আঞ্চলিক দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ ও শক্ত করা প্রয়োজন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে উপসাগরীয় আরব দেশগুলো দুই হাজারের বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখোমুখি হয়েছে। এসব হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। এর মধ্যে মার্কিন কূটনৈতিক মিশন, সামরিক ঘাঁটি, তেল অবকাঠামো, বন্দর, বিমানবন্দর, হোটেল এবং আবাসিক ও অফিস ভবনও রয়েছে।
২০২০ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সিদ্ধান্ত নেয়। সাম্প্রতিক হামলাগুলোর মধ্যে এই দেশটিই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রায় সব আরব দেশই এসব ঘটনার প্রভাব ভোগ করেছে এবং অনেক দেশই ইরানের নিন্দা জানিয়েছে।
বিশ্লেষক এবং আঞ্চলিক সূত্রগুলো বলছে, দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তার প্রধান গ্যারান্টার হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। তবে বর্তমানে এই দেশগুলোর মধ্যে এমন একটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার কারণে হতাশা বাড়ছে।
তাদের মতে, অনেক দেশ যুদ্ধের প্রতি সমর্থন জানালেও এর কারণে বড় ধরনের মূল্য দিতে হচ্ছে।
এদিকে সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলে হামলার ঘটনা ঘটছে। এই অঞ্চলেই দেশটির বেশিরভাগ তেল উৎপাদিত হয়।
এছাড়া রিয়াদের পূর্বদিকে অবস্থিত প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে আগে মার্কিন বাহিনী অবস্থান করেছিল। পাশাপাশি সৌদি রাজধানীর পশ্চিম প্রান্তে কূটনৈতিক কোয়ার্টারও রয়েছে।
সৌদি আরব ও ইরান বহু বছর ধরে শত্রুতার মধ্যে থাকলেও ২০২৩ সালে দুই দেশ আবার কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করে। দীর্ঘদিনের বৈরিতার পর এই পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে উত্তেজনা কিছুটা কমাতে সহায়তা করেছিল।
এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে দুই দেশের সমর্থিত প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক ও সামরিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে উত্তেজনাও কিছুটা কমে আসে বলে মনে করা হয়।
এদিকে সৌদি আরবের তেল স্থাপনাগুলোর ওপর সাম্প্রতিক হামলার ঘটনায় ইরানের সম্পৃক্ততা নেই বলেও দাবি করেছেন রাষ্ট্রদূত আলিরেজা এনায়াতি।
তিনি বলেন, এসব হামলার জন্য ইরান দায়ী নয়। তার দাবি, যদি ইরান এ ধরনের হামলা চালাত, তাহলে তারা তা প্রকাশ করত। তবে এসব হামলার জন্য কারা দায়ী সে বিষয়ে তিনি কোনো নির্দিষ্ট মন্তব্য করেননি।
উল্লেখ্য, সৌদি আরবের পূর্ব উপকূলে অবস্থিত রাস তানুরা শোধনাগার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সীমান্তের কাছে মরুভূমিতে অবস্থিত শায়বা তেলক্ষেত্রে ড্রোন হামলার চেষ্টার ঘটনাও ঘটেছে।
তবে সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতেও এসব ঘটনার জন্য নির্দিষ্টভাবে কাউকে দায়ী করা হয়নি।
রাষ্ট্রদূত এনায়াতি দাবি করেন, ইরান কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লক্ষ্যবস্তু এবং স্বার্থের ওপরই হামলা চালাচ্ছে।
তিনি আরও জানান, সৌদি কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে এবং দুই দেশের সম্পর্ক ধীরে ধীরে স্বাভাবিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে।
এছাড়া ধর্মীয় তীর্থযাত্রার জন্য সৌদি আরবে আসা ইরানিদের দেশে ফিরে যাওয়া এবং অসুস্থদের চিকিৎসা সহায়তার ক্ষেত্রেও সৌদি আরব সহযোগিতা করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এনায়াতি বলেন, সৌদি আরব প্রকাশ্যে জানিয়েছে যে তাদের স্থল, আকাশ ও সমুদ্রপথ ইরানের বিরুদ্ধে কোনো হামলার জন্য ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। এ বিষয়ে তেহরান রিয়াদের সঙ্গে যোগাযোগও বজায় রাখছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্দেশে তিনি বলেন, বর্তমান যুদ্ধ ইরান এবং পুরো অঞ্চলের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার মতে, এই সংঘাতের অবসান ঘটাতে হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে হামলা বন্ধ করতে হবে এবং আঞ্চলিক দেশগুলোকে এতে জড়ানো যাবে না।
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে যেন এমন হামলা না ঘটে সে জন্য আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তা প্রয়োজন।
তার ভাষায়, কেবল তখনই পুরো অঞ্চলকে একটি সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হবে।
কসমিক ডেস্ক