জুলাই আন্দোলনে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়-এর শিক্ষার্থী শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলায় গুরুত্বপূর্ণ রায় ঘোষণা করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিচারিক প্যানেল দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করে।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি হলেন পুলিশের সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আমির হোসেন এবং সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়। তারা বর্তমানে গ্রেপ্তার অবস্থায় রয়েছেন।
অন্যদিকে যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন—পুলিশের সাবেক সহকারী কমিশনার মো. আরিফুজ্জামান, সাবেক পরিদর্শক (নিরস্ত্র) রবিউল ইসলাম এবং সাবেক উপপরিদর্শক (নিরস্ত্র) বিভূতিভূষণ রায়। তারা পলাতক রয়েছেন। এছাড়া মামলার অন্যান্য আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এই রায় ঘোষণা করেন ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ। অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
মামলার মোট আসামি সংখ্যা ৩০ জন। এর মধ্যে ছয়জন বর্তমানে গ্রেপ্তার আছেন। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে রয়েছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল, সাবেক চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী আনোয়ার পারভেজ, এএসআই আমির হোসেন, কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায় এবং নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতা ইমরান চৌধুরী ওরফে আকাশ।
অন্যদিকে ২৪ জন আসামি পলাতক রয়েছেন। পলাতকদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য মো. হাসিবুর রশীদ, বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা, পুলিশ কর্মকর্তাসহ ছাত্রলীগের একাধিক নেতা রয়েছেন।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই, যখন রংপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় আবু সাঈদ গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। এই ঘটনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে তদন্ত শুরু হয়।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ২৪ জুন ৩০ জনকে আসামি করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। এরপর ৬ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করে ট্রাইব্যুনাল। একই বছরের ২৭ আগস্ট মামলার বিচার কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।
মামলার প্রথম সাক্ষী হিসেবে আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন জবানবন্দি দেন। চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয় এবং ২৭ জানুয়ারি যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়।
এই রায়কে কেন্দ্র করে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক দৃষ্টান্ত, যা ভবিষ্যতে এ ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানকে আরও জোরদার করবে।
নিহতের পরিবার ও সহপাঠীদের মধ্যে এই রায় আংশিক স্বস্তি এনে দিলেও পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার ও দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার দাবি জোরালো হয়েছে।
উপসংহারে, আবু সাঈদ হত্যা মামলার এই রায় দেশের বিচারব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে পূর্ণ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার এবং রায়ের কার্যকর বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি।
কসমিক ডেস্ক