ঠাকুরগাঁও জেলায় বিএসটিআই-এর অনুমোদন ছাড়াই যত্রতত্র গড়ে উঠেছে ভেজাল ও নিম্নমানের লাচ্ছা সেমাই তৈরির কারখানা। আসন্ন ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে এসব অস্থায়ী কারখানায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ক্ষতিকর রং মিশিয়ে সেমাই উৎপাদনের অভিযোগ উঠেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার বিসিক শিল্প নগরী, রোড মথুরাপুর, জগন্নাথপুর, সালান্দর ও গড়েয়াসহ জেলার বালিয়াডাঙ্গী, রাণীশংকৈল এবং পীরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বিএসটিআই-এর অনুমোদন ছাড়াই অস্থায়ীভাবে শতাধিক সেমাই কারখানা গড়ে উঠেছে।
এসব কারখানায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে লাচ্ছা সেমাই উৎপাদন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
সম্প্রতি বিভিন্ন সেমাই কারখানায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভ্যাপসা গরমের মধ্যে শ্রমিকরা কোনো ধরনের সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়াই খালি হাতে সেমাই তৈরি করছেন। অনেক শ্রমিক দস্তানা ব্যবহার না করেই সেমাই প্রস্তুত করছেন।
কারখানার ভেতরের পরিবেশও অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর। লাচ্ছা সেমাই তৈরির জন্য রাখা খামির ও ডালদার ওপর অসংখ্য মাছি বসে থাকতে দেখা যায়। কোথাও কোথাও তেলের মধ্যে মরা মাছিও পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
এভাবেই মাছিসহ প্রস্তুত করা হচ্ছে লাচ্ছা সেমাই।
অভিযোগ রয়েছে, ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে এসব লাচ্ছা সেমাইয়ে নিম্নমানের ডালদা ও কৃত্রিম রং ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া ঘি-এর পরিবর্তে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে, যা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
মথুরাপুর এলাকার মিমি লাচ্ছা সেমাই কারখানার কারিগর আব্দুস সামাদ জানান, তিনি নীলফামারীর সৈয়দপুর থেকে প্রতিবছর এই কারখানায় লাচ্ছা তৈরির কাজ করতে আসেন।
তিনি বলেন, রমজানের প্রথম সপ্তাহ থেকে প্রায় ১৫ দিন লাচ্ছা তৈরি করে পারিশ্রমিক নিয়ে বাড়ি ফিরে যান। তার সঙ্গে আরও কয়েকজন কারিগর কাজ করতে এসেছেন।
আরেক কারিগর জমির আলী জানান, রং ছাড়া লাচ্ছা তৈরি করলে অনেক সময় ক্রেতারা তা পছন্দ করেন না। তাই ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে লাচ্ছায় সামান্য রং ব্যবহার করা হয়।
তিনি আরও বলেন, ঘি-এ ভাজা লাচ্ছায়ও কখনো কখনো তরল পদার্থ মিশিয়ে ঘি-এর গন্ধ তৈরি করা হয়।
অন্যদিকে অস্থায়ী কারখানার কারিগর শমশের আলী জানান, জায়গা কম থাকায় অনেক সময় টয়লেট বা খোলা বাথরুমের পাশেই অস্থায়ীভাবে লাচ্ছা তৈরি করা হচ্ছে।
একই কারখানার কারিগর মোহাম্মদ লিটন বলেন, বাজারে যেসব লাচ্ছা সেমাই ঘি-এ ভাজা বলে বিক্রি করা হয়, তার অনেকগুলোই আসলে রাসায়নিক ব্যবহার করে তৈরি করা হয়।
তিনি বলেন, বর্তমানে বাজারে ঘি-এর দাম প্রতি কেজি এক হাজার থেকে ১২০০ টাকা। এত দাম দিয়ে ঘি কিনে লাচ্ছা তৈরি করলে লাভ করা সম্ভব নয়। তাই অনেকেই গরম লাচ্ছার ওপর স্প্রে মেশিন দিয়ে ঘি-এর গন্ধযুক্ত রাসায়নিক ছিটিয়ে বিক্রি করেন।
বিসিক এলাকার শোভা লাচ্ছা সেমাই কারখানার মালিক জাহাঙ্গীর খান বলেন, ঈদকে সামনে রেখে শহরে অনেক অস্থায়ী সেমাই কারখানা গড়ে উঠেছে।
তার মতে, এসব কারখানায় ভেজাল লাচ্ছা সেমাই তৈরি করে কম দামে বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। দাম কম হওয়ায় অনেক ক্রেতা মান যাচাই না করেই এসব সেমাই কিনছেন।
তিনি বলেন, মৌসুমভিত্তিক এসব অস্থায়ী কারখানার বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযান পরিচালনা করা প্রয়োজন।
এদিকে সাধারণ ভোক্তারাও ভেজাল সেমাই নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
সদর উপজেলার কলেজপাড়া এলাকার মীর প্রীতম বলেন, প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে শহরে অনেক অস্থায়ী সেমাই কারখানা গড়ে উঠেছে।
তার মতে, এসব কারখানায় তৈরি নিম্নমানের সেমাই মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
সরকারপাড়া এলাকার বাসিন্দা রাশেদুল আলম বলেন, বাজারে বিভিন্ন ধরনের বাহারি প্যাকেটে দেশি ও পাকিস্তানি লাচ্ছা সেমাই বিক্রি করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, এসব সেমাইয়ের গুণগত মান সাধারণ ভোক্তাদের পক্ষে যাচাই করা কঠিন।
অন্যদিকে হাজিপাড়া এলাকার বাসিন্দা মকলেছুর রহমান বলেন, বর্তমানে বাজারে যে লাচ্ছা সেমাই পাওয়া যাচ্ছে তার অনেকগুলোই নিম্নমানের।
তিনি বলেন, অনেক সেমাইয়ের মোড়কে বিএসটিআই-এর অনুমোদন নেই এবং বিভিন্ন ধরনের রং ব্যবহার করা হচ্ছে, যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
ঠাকুরগাঁও ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোহা. ফিরোজ জামান বলেন, লাচ্ছা সেমাইয়ে যদি কৃত্রিম রং বা রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়, তবে তা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
তিনি বলেন, এসব পদার্থ শরীরে প্রবেশ করলে ক্যান্সারের মতো জটিল রোগের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই রং মেশানো লাচ্ছা সেমাই না খাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক ইশরাত ফারজানা বলেন, জেলায় অবৈধ কারখানায় ভেজাল লাচ্ছা সেমাই তৈরি ও বিক্রি বন্ধে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ভেজাল বন্ধে প্রশাসনের পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে।
কসমিক ডেস্ক