দুই দশকের বেশি সময় ধরে যারা বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর জোটকে ভোট দিয়ে আসছিলেন, তাদের একটি বড় অংশ এবার ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি। এবারের নির্বাচনে দল দুটি আর একসঙ্গে নয়—বরং প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে নেমেছে। ফলে দীর্ঘদিনের সেই ভোটব্যাংকের একটি অংশ এখন সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন।
এই দ্বিধান্বিত ভোটারদের নিজের পক্ষে টানাই এখন বিএনপি ও জামায়াত—দুই দলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে কারণেই জনসভা বা বড় সমাবেশের চেয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সরাসরি ভোট চাওয়ার কৌশলকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন প্রার্থীরা।
এই চিত্র শুধু রাজধানীর পল্লবী ও রূপনগর থানা এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৬ আসনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশের বিভিন্ন আসনেই একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে।
রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, ১৯৯৬ সালের সপ্তম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াত শেষবার আলাদাভাবে নির্বাচন করেছিল। এরপর চারদলীয় জোট গঠনের মাধ্যমে তারা একসঙ্গেই নির্বাচনে অংশ নেয়। ২০১৮ সালে জামায়াতের নিবন্ধন স্থগিত থাকায় দলটির নেতারা বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। কিন্তু এবার দুই দল আলাদাভাবে মাঠে নামায় ভোটারদের সামনে তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন—কাকে সমর্থন দেবেন তারা।
আওয়ামী লীগ নির্বাচনের বাইরে থাকায় বিএনপি–জামায়াত জোটের পুরোনো ভোটারদের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ভোটও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই ভোটের ভাগ-বাটোয়ারা জয়ের সমীকরণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রচার পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ঢাকা-১৬ আসনে বিএনপির প্রার্থী আমিনুল হক এবং জামায়াতের প্রার্থী আব্দুল বাতেন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ভোটারদের বাসায় বাসায় গিয়ে ভোট চাইছেন। আমিনুল হক মিরপুর-১২ নম্বর এলাকার সি ও ডি ব্লকে প্রচার চালাচ্ছেন, আর আব্দুল বাতেন কুর্মিটোলা বিহারি ক্যাম্পসহ আশপাশের এলাকায় প্রচারণা চালাচ্ছেন।
জামায়াতের প্রচার সেলের এক সদস্য জানান, শুরুতে উঠান বৈঠকের ওপর জোর দেওয়া হলেও এখন মূল লক্ষ্য দ্বিধান্বিত ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা। একই কথা বলছেন বিএনপির প্রচার দলের সদস্যরাও। তাদের মতে, মুখোমুখি যোগাযোগ ছাড়া ভোটারদের আস্থা পাওয়া কঠিন।
এদিকে প্রচারণার মাঠে দুই পক্ষের মধ্যে অভিযোগ–পাল্টা অভিযোগও চলছে। বিএনপির প্রার্থী আমিনুল হক অভিযোগ করেছেন, জামায়াতের পক্ষ থেকে অর্থ ও মোবাইল নম্বর সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থী আব্দুল বাতেন অভিযোগ তুলেছেন, বিএনপির পক্ষ থেকে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষকে খামে টাকা দেওয়া হচ্ছে।
তবে ভোটারদের বড় অংশ এসব অভিযোগের চেয়ে নিজেদের দৈনন্দিন সমস্যার সমাধানকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। পল্লবী ও কুর্মিটোলা এলাকার বাসিন্দারা মাদক, বেকারত্ব, জলাবদ্ধতা, গ্যাস–বিদ্যুৎ–পানির সংকট এবং চাঁদাবাজির কথা তুলে ধরেছেন।
এক ভোটারের ভাষায়, ‘বিএনপি বা জামায়াত নয়, যে আমাদের সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসবে—আমরা তাকেই ভোট দেব।’
এই বাস্তবতায় জোট ভাঙার পর ভোটের মাঠে শুধু প্রার্থীদের নয়, ভোটারদের সিদ্ধান্তও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।