দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় রাজধানী ঢাকা এবং এর আশপাশের এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নরসিংদী, রূপগঞ্জ, বাড্ডা ও গাজীপুরের মতো ঢাকার নিকটবর্তী এলাকাগুলোতে ভূমিকম্পের উৎপত্তি হওয়ায় অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—এগুলো কি কোনো বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস?
সর্বশেষ ২২ জুন রাতে অনুভূত ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল প্রায় ৪ থেকে ৪.৪ এর মধ্যে। বিভিন্ন সংস্থার তথ্যে উৎপত্তিস্থল নিয়ে সামান্য পার্থক্য থাকলেও এটি নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ সংলগ্ন এলাকায় ছিল বলে জানা যায়। উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের অল্প গভীরে, যা রাজধানীতেও স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়।
এর আগে গত বছরের নভেম্বরে নরসিংদী অঞ্চলে ৫.৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্প দেশের বিভিন্ন এলাকায় অনুভূত হয়েছিল। পরবর্তী কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একই অঞ্চলে আরও কয়েকটি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়। এরপরও নরসিংদী ও ঢাকার আশপাশে ছোট ও মাঝারি মাত্রার একাধিক কম্পন দেখা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ এমন একটি ভূতাত্ত্বিক অঞ্চলে অবস্থিত যেখানে তিনটি প্রধান টেকটোনিক প্লেটের প্রভাব রয়েছে। Indian Plate, Eurasian Plate এবং Burma Plate-এর পারস্পরিক গতিশীলতার কারণে এ অঞ্চলে নিয়মিত ভূমিকম্প ঘটে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. বদরুদ্দোজা মিয়া মনে করেন, সাম্প্রতিক কম্পনগুলো সক্রিয় ফল্ট বা টেকটোনিক কার্যকলাপের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা ফল্টও পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর ভূমিকম্প গবেষক মেহেদি আহমেদ আনসারী মনে করেন, সাম্প্রতিক ছোট বা মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পগুলোকে সরাসরি বড় ধরনের বিপর্যয়ের পূর্বাভাস হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে এগুলো মানুষকে ভূমিকম্প সম্পর্কে সচেতন হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে।
তার মতে, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি রয়েছে ঐতিহাসিকভাবে শক্তিশালী ভূমিকম্প সৃষ্টি করতে সক্ষম ফল্টগুলোতে। বিশেষ করে শ্রীমঙ্গল অঞ্চল এবং শেরপুর এলাকার আশপাশে অতীতে ৭ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছে। ১৯১৮ সালে শ্রীমঙ্গলে ৭.৬ মাত্রার এবং ১৮৮৫ সালে শেরপুর অঞ্চলে ৭.১ মাত্রার ভূমিকম্পের রেকর্ড রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, বড় ভূমিকম্পের পুনরাবৃত্তির একটি দীর্ঘ সময়চক্র থাকে। ফলে ভবিষ্যতে শক্তিশালী ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া না গেলেও ঠিক কখন তা ঘটবে, সে বিষয়ে নির্ভুল পূর্বাভাস দেওয়া বর্তমান বিজ্ঞানেও সম্ভব নয়।
ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের কর্মকর্তারাও বলছেন, ঢাকাকে কেন্দ্র করে অতীতে বড় ভূমিকম্পের ইতিহাস তুলনামূলকভাবে কম। তবে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন ফল্ট জোনে বড় ভূমিকম্পের নজির রয়েছে। তাই রাজধানী সরাসরি উৎপত্তিস্থল না হলেও বড় ভূমিকম্পের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বহন করে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ঢাকার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ভূমিকম্পের সংখ্যা নয়, বরং নগরীর ঘনবসতি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং ভবনের কাঠামোগত দুর্বলতা। একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি হতে পারে। তাই আতঙ্কিত না হয়ে ভবন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দুর্যোগ প্রস্তুতি বাড়ানো এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
কসমিক ডেস্ক