জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) নতুন একটি একাডেমিক ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবকে ঘিরে শিক্ষক মহলে নানা ধরনের মতামত সামনে এসেছে। প্রস্তাবিত ‘ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক স্টাডিজ অ্যান্ড থিওলজি’-এর অধীনে ছয়টি পৃথক বিভাগ চালুর বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৩তম বার্ষিক সিনেট সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের কথা রয়েছে। সিনেটে অনুমোদন পেলে পরবর্তী ধাপে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন সাপেক্ষে বিভাগগুলো চালুর প্রক্রিয়া এগোতে পারে।
প্রস্তাবিত বিভাগগুলোর মধ্যে রয়েছে আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ, আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ, ইসলামিক হিস্ট্রি অ্যান্ড কালচার, ইসলামিক ল, ফিকহ অ্যান্ড জুরিসপ্রুডেন্স, ইসলামিক ফিলোসফি, এথিকস অ্যান্ড কমপারেটিভ রিলিজিয়ন এবং অ্যারাবিক ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড লিটারেচার। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব বিভাগের মাধ্যমে ইসলামী জ্ঞানচর্চাকে গবেষণাভিত্তিক ও সমসাময়িক উচ্চশিক্ষার সঙ্গে আরও সমন্বিত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে এ উদ্যোগকে ঘিরে শিক্ষক সমাজে একক অবস্থান তৈরি হয়নি। একাংশের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং, প্রকৌশল, চিকিৎসাবিজ্ঞান, খাদ্য প্রযুক্তি ও কৃষিবিজ্ঞানসহ ভবিষ্যতমুখী বিষয়ে নতুন বিভাগ চালু করাই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অধিক প্রয়োজনীয়। তাদের মতে, সীমিত সম্পদ ও অবকাঠামোর মধ্যে কর্মসংস্থানমুখী এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা সম্প্রসারণে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মোজাহিদুল ইসলাম মত দেন যে, প্রস্তাবিত বেশ কয়েকটি বিষয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাধারণত পৃথক বিভাগ হিসেবে পরিচালিত হয় না। তার মতে, ইসলামিক হিস্ট্রি অ্যান্ড কালচার ব্যতীত অন্যান্য বিষয়কে একীভূত করে পরিচালনা করা অধিক বাস্তবসম্মত হতে পারে। তিনি আরও বলেন, নতুন বিভাগ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একাডেমিক প্রয়োজনীয়তা, গবেষণার সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
আইন ও বিচার অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. রবিউল ইসলামও ইসলামিক ল ও ফিকহ বিষয়ে পৃথক বিভাগ চালুর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তার মতে, বিদ্যমান আইন পাঠ্যক্রমেই এসব বিষয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি ভবিষ্যতে আইন ও জননীতি (ল অ্যান্ড পাবলিক পলিসি) বিষয়ে নতুন বিভাগ চালুর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষক মত দেন, ইসলামিক স্টাডিজ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হলেও প্রাথমিকভাবে স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি পর্যায়ে শিক্ষা কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখা যেতে পারে। তার মতে, একসঙ্গে একাধিক বিভাগ চালু করলে প্রশাসনিক ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি অবকাঠামোগত চাপও বাড়তে পারে।
অন্যদিকে, প্রস্তাবটির সমর্থকেরা বলছেন, দেশে দীর্ঘদিন ধরে আধুনিক পদ্ধতিতে ইসলামী উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারণের দাবি ছিল। সুপারিশ কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক এম মাহফুজুর রহমানের মতে, দেশের সামাজিক বাস্তবতা, ইতিহাস ও সংস্কৃতির আলোকে এ ধরনের একটি ইনস্টিটিউট উচ্চশিক্ষায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। তিনি মনে করেন, গবেষণানির্ভর ইসলামিক স্টাডিজ শিক্ষা ধর্মীয় জ্ঞান ও আধুনিক একাডেমিক চর্চার মধ্যে একটি কার্যকর সংযোগ তৈরি করতে সক্ষম হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক এম আব্দুর রব জানিয়েছেন, প্রস্তাবটি এখনো নীতিগত পর্যায়ে রয়েছে। সিনেটে অনুমোদন পেলেও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) অনুমোদন ছাড়া কোনো নতুন ইনস্টিটিউট বা বিভাগ আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা যাবে না। পাশাপাশি তিনি জানান, ভবিষ্যতে এআই, মেশিন লার্নিং, চিকিৎসাবিজ্ঞান, প্রকৌশল, খাদ্য ও কৃষিবিষয়ক নতুন অনুষদ ও বিভাগ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবও বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলে উপস্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, সিনেটে সদস্যদের আলোচনা ও মতামতের ভিত্তিতেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উন্মুক্ত ও গবেষণাভিত্তিক পরিবেশে ধর্মীয় বিষয়েও উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারণ জ্ঞানচর্চাকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক একাডেমিক উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ চাহিদার বিষয়গুলোও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় বিবেচনায় রাখা হবে।
কসমিক ডেস্ক