জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার গারো পাহাড় এলাকায় ভারতীয় বন্যহাতির আক্রমণে জয়নাল আবদিন (৫৫) নামে এক কাঠশ্রমিক নিহত হয়েছেন। সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। শনিবার (২৭ জুন) সকালে বন বিভাগের কর্মীরা তার মরদেহ উদ্ধার করেন। এর আগে শুক্রবার রাতে সোমনাথপাড়া এলাকার ১০৮৮ নম্বর সীমান্ত পিলার সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকায় এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।
নিহত জয়নাল আবদিন ধানুয়া কামালপুর ইউনিয়নের মৃর্ধাপাড়া গ্রামের মৃত অনিক মণ্ডলের ছেলে। জীবিকার তাগিদে তিনি দীর্ঘদিন ধরে কাঠ সংগ্রহের কাজ করতেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, পাহাড়ি এলাকায় কাঠ কেটে জীবিকা নির্বাহ করাই ছিল তার প্রধান পেশা। তবে সেই কাজই শেষ পর্যন্ত তার জীবনের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার সকালে কাঠ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে গারো পাহাড়ে যান জয়নাল আবদিন। দিনের বেলায় তিনি স্বাভাবিকভাবেই কাজ করছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু সন্ধ্যার পরও তিনি বাড়ি না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। রাত গভীর হলেও তার কোনো খোঁজ না মেলায় স্বজনরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। আশপাশের লোকজনের কাছেও তার সন্ধান পাওয়া যায়নি।
পরদিন শনিবার সকালে বন বিভাগের কর্মীরা সোমনাথপাড়া এলাকার পাহাড়ি অঞ্চলে তার মরদেহ দেখতে পান। পরে তারা মরদেহ উদ্ধার করে পরিবারকে খবর দেন। ঘটনাস্থলটি সীমান্ত পিলার ১০৮৮-এর কাছাকাছি হওয়ায় এলাকাটি ভারতীয় বন্যহাতির চলাচলের জন্য পরিচিত। ফলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, রাতের কোনো এক সময় বন্যহাতির আক্রমণেই তার মৃত্যু হয়েছে।
বালিঝুড়ি রেঞ্জের বন কর্মকর্তা মো. সুমন মিয়া জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে শুক্রবার রাত ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে বন্যহাতির আক্রমণে জয়নাল আবদিনের মৃত্যু হয়েছে। তিনি বলেন, মরদেহ উদ্ধার করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বন বিভাগের পক্ষ থেকে ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং স্থানীয়ভাবে সতর্কতা জোরদার করা হয়েছে।
এদিকে বকশীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মকবুল হোসেন জানান, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তিনি আরও বলেন, সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় বন্যহাতির আনাগোনা নতুন কিছু নয়। তবে মানুষের জীবনহানির ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আরও সতর্ক থাকতে হবে।
গারো পাহাড় ও এর আশপাশের এলাকায় বন্যহাতির চলাচল দীর্ঘদিনের সমস্যা। বিশেষ করে খাদ্যের সন্ধানে হাতির দল লোকালয়ে ঢুকে পড়ে, ফলে কৃষক, শ্রমিক ও পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দারা প্রায়ই ঝুঁকির মুখে পড়েন। কাঠ সংগ্রহ, কৃষিকাজ কিংবা পাহাড়ি পথে চলাচলের সময় অনেকেই হঠাৎ বন্যহাতির মুখোমুখি হন। এতে প্রাণহানি, আহত হওয়ার ঘটনা এবং ফসলের ক্ষয়ক্ষতি নিয়মিতই ঘটছে।
স্থানীয়রা বলছেন, এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধে বন বিভাগের নজরদারি আরও বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি সীমান্তবর্তী এলাকায় হাতির চলাচলের পথ চিহ্নিত করে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর পাহাড়ি এলাকায় একা চলাচল না করার বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
জয়নাল আবদিনের মৃত্যুতে তার পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। জীবিকার তাগিদে পাহাড়ে গিয়ে আর ঘরে ফেরা হলো না তার। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে মৃর্ধাপাড়া গ্রাম। স্থানীয়রাও এই ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং নিহতের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।
সব মিলিয়ে, বকশীগঞ্জের গারো পাহাড়ে বন্যহাতির আক্রমণে কাঠশ্রমিক জয়নাল আবদিনের মৃত্যু আবারও মানব-হাতি সংঘাতের ভয়াবহ বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। সীমান্তবর্তী পাহাড়ি অঞ্চলে মানুষের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি এখন আরও জোরালো হয়ে উঠেছে।
কসমিক ডেস্ক