ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশ যখন অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করছে, ঠিক তখনই সম্পূর্ণ ভিন্ন ও মানবিক অবস্থান নিল স্পেন। দেশটির সমাজতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের নেতৃত্বাধীন সরকার প্রায় পাঁচ লাখ অনথিভুক্ত বা অবৈধ অভিবাসীকে বৈধ মর্যাদা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) এক সংবাদ সম্মেলনে স্পেনের অভিবাসনমন্ত্রী এলমা সাইজ এই ঐতিহাসিক উদ্যোগের ঘোষণা দেন। তিনি জানান, এই প্রক্রিয়ার আওতায় বৈধতা পাওয়া অভিবাসীরা স্পেনের যেকোনো অঞ্চলে এবং যেকোনো খাতে আইনগতভাবে কাজ করার সুযোগ পাবেন।
স্পেন সরকার বলছে, অভিবাসীরা দেশটির অর্থনীতি ও সমাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। কর্মক্ষম জনসংখ্যা কমে যাওয়া, দ্রুত বার্ধক্য এবং পেনশন ব্যবস্থার ওপর বাড়তে থাকা চাপ মোকাবিলায় নতুন শ্রমশক্তি স্পেনের জন্য এখন অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
মন্ত্রী এলমা সাইজ বলেন, যারা ইতিমধ্যে স্পেনে বসবাস করে শ্রম দিয়ে দেশ গঠনে ভূমিকা রাখছেন, এই উদ্যোগের মাধ্যমে তাদের সম্মান ও স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে। বৈধতার ফলে তারা শ্রমিক অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার আওতায় আসবেন।
এই ঘোষণায় দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তায় থাকা হাজারো অভিবাসীর জীবনে আশার আলো জ্বলেছে। পেরু থেকে আসা ৩০ বছর বয়সী জোয়েল ক্যাসেডা গত ছয় বছর ধরে স্পেনে অবৈধভাবে প্যাকেট ডেলিভারির কাজ করছেন। একটি দুর্ঘটনায় হাত হারানোর পরও তিনি কাজ চালিয়ে গেছেন। আল জাজিরাকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, বৈধতা মানে এখন পরিবার নিয়ে নিরাপদ ও স্থায়ী জীবনের স্বপ্ন দেখা।
ওউসমান উমর ও লামিন সারের মতো সাবেক অভিবাসীরাও সরকারের এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, বৈধভাবে কাজ করার সুযোগ পেলে অভিবাসীরা কর ও সামাজিক নিরাপত্তা তহবিলে অবদান রাখতে পারবেন, যা পুরো স্প্যানিশ সমাজের জন্য লাভজনক হবে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, যেসব অভিবাসী অন্তত পাঁচ মাস ধরে স্পেনে অবস্থান করছেন এবং ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে আন্তর্জাতিক সুরক্ষার জন্য আবেদন করেছেন, তারা এই বৈধতার আওতায় আসতে পারবেন। আগামী এপ্রিল থেকে জুন মাসের মধ্যে আবেদন গ্রহণ করা হবে।
তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছে স্পেনের ডানপন্থী ও অতি-ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো। ‘ভক্স’ দলের নেতা সান্তিয়াগো আবাসকাল এই উদ্যোগকে ‘অনুপ্রবেশ’ আখ্যা দিয়ে দাবি করেছেন, এতে আরও অবৈধ অভিবাসী স্পেনে প্রবেশে উৎসাহিত হবে এবং স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়বে।
সব বিতর্কের মধ্যেও সংসদে ভোট ছাড়াই ডিক্রি জারির মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে এগোচ্ছে স্পেনের বর্তমান জোট সরকার। ইউরোপের অভিবাসন রাজনীতিতে এই পদক্ষেপকে একটি ব্যতিক্রমী ও গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কসমিক ডেস্ক