জার্মানির খুচরা খাতে চুরি ও পণ্য হারানোর ঘটনা নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশটির দোকানগুলোতে পণ্য চুরির পরিমাণ আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। এর ফলে ব্যবসায়ীরা কয়েক বিলিয়ন ইউরোর আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
জার্মানির খুচরা খাত নিয়ে গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান ইএইচআই (EHI) প্রকাশিত নতুন সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশজুড়ে দোকানগুলো থেকে মোট ৪ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ইউরো মূল্যের পণ্য চুরি হয়েছে। আগের বছরের তুলনায় এই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩ দশমিক ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিষয়টি জার্মান ব্যবসায়ী মহলে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
গবেষণায় উঠে এসেছে, পণ্য চুরির বড় একটি অংশ সাধারণ ক্রেতাদের মাধ্যমে সংঘটিত হলেও সংগঠিত অপরাধী চক্রগুলোর ভূমিকা ক্রমেই বাড়ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোট চুরির প্রায় এক-তৃতীয়াংশই সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে ঘটেছে। এসব চক্র সাধারণ ক্রেতার ছদ্মবেশে দোকানে প্রবেশ করে মূল্যবান পণ্য চুরি করে থাকে।
বিশেষ করে মদ, প্রসাধনী সামগ্রী, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সুগন্ধি এবং শেভিং ব্লেডের মতো তুলনামূলক উচ্চমূল্যের পণ্য চুরির হার বেশি। পরে এসব পণ্য অবৈধ বাজারে বিক্রি করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শুধু ক্রেতাদের মাধ্যমেই নয়, খুচরা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরেও চুরির ঘটনা উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। সমীক্ষা অনুযায়ী, কর্মচারীদের মাধ্যমে সংঘটিত চুরির কারণে গত বছর প্রায় ৯১ কোটি ইউরো ক্ষতি হয়েছে। অন্যদিকে সরবরাহকারী ও ডেলিভারি ব্যবস্থার বিভিন্ন অনিয়ম ও চুরির কারণে আরও প্রায় ৩৭ কোটি ইউরো ক্ষতি হয়েছে।
গবেষণাটি আরও দেখিয়েছে যে, সব ক্ষতির পেছনে সরাসরি চুরি দায়ী নয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ত্রুটি, হিসাবের ভুল, মূল্যছাড় সংক্রান্ত স্টিকার সময়মতো অপসারণ না করা কিংবা সরবরাহ ব্যবস্থার গরমিলের কারণে বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। শুধুমাত্র এসব ব্যবস্থাপনাগত সমস্যার কারণেই ২০২৫ সালে প্রায় ৭৮ কোটি ইউরো ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রযুক্তিনির্ভর কেনাকাটার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নতুন ধরনের প্রতারণাও সামনে আসছে। বিশেষ করে সেলফ-চেকআউট বা স্বয়ংক্রিয় বিল পরিশোধ ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে প্রতারণার ঘটনা বাড়ছে। কিছু ক্রেতা ইচ্ছাকৃতভাবে পণ্য স্ক্যান না করে কিংবা কম মূল্যের পণ্যের তথ্য দেখিয়ে মূল্যবান পণ্য নিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে। ফলে ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।
ইএইচআই-এর তথ্য অনুযায়ী, জার্মানির ২১ হাজারেরও বেশি দোকানে সংঘটিত এসব চুরির কারণে সরকার প্রতি বছর প্রায় ৫৯ কোটি ইউরো ভ্যাট রাজস্ব হারাচ্ছে। অর্থাৎ ক্ষতির প্রভাব শুধু ব্যবসায়ী পর্যায়েই সীমাবদ্ধ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ব্যবস্থার ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির চাপ এই প্রবণতা বাড়িয়ে দিতে ভূমিকা রাখছে। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে অনেক মানুষ আর্থিক চাপে পড়ছেন, যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে খুচরা খাতের অপরাধ প্রবণতায়।
জার্মান খুচরা ব্যবসায়ী সমিতি (HDE) আরও জানিয়েছে, প্রকৃত পরিস্থিতি সম্ভবত প্রতিবেদনে উল্লেখিত সংখ্যার চেয়েও গুরুতর। কারণ অধিকাংশ চুরির ঘটনা কখনোই আনুষ্ঠানিকভাবে রিপোর্ট করা হয় না। সংগঠনটির দাবি, প্রায় ৯৮ শতাংশ ঘটনা অভিযোগ আকারে নথিভুক্ত হয় না। আইনি জটিলতা, সময় অপচয় এবং প্রশাসনিক ঝামেলার কারণে অনেক ব্যবসায়ী অভিযোগ দায়ের থেকে বিরত থাকেন।
ফলে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, জার্মানির খুচরা খাতে প্রকৃত আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বর্তমানে প্রকাশিত তথ্যের চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে।
কসমিক ডেস্ক