বগুড়ায় সড়ক দুর্ঘটনা দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। প্রতিনিয়ত ঘটছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা, ঝরে যাচ্ছে তরুণ ও শিক্ষার্থীদের জীবন। জেলা পুলিশের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র চার মাসেই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪৯ জন।
তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে নিহত হন ১৩ জন, ফেব্রুয়ারিতে ১০ জন, মার্চে ১৪ জন এবং এপ্রিলে ১২ জন। এর আগে ২০২৫ সালের পুরো বছরে জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন আরও ১২০ জন। সব মিলিয়ে গত ১৬ মাসে বগুড়ার বিভিন্ন সড়কে প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬৯ জনে।
এই হিসাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতি মাসে গড়ে ১০ জনেরও বেশি মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছেন। নিহতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ কিশোর, তরুণ ও শিক্ষার্থী। বিশেষ করে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণহানির হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।
স্থানীয়দের মতে, বেপরোয়া গতি, হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো এবং মহাসড়কে ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিংয়ের কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে। অনেক তরুণ সড়ক নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন না হওয়ায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৬ মাসে বগুড়া সদর থানায় ৩৪টি, শেরপুর থানায় ৩১টি, শাজাহানপুর থানায় ২৯টি এবং শিবগঞ্জ থানায় ২১টি সড়ক দুর্ঘটনার মামলা হয়েছে। এছাড়া জেলার অন্যান্য থানাতেও একাধিক দুর্ঘটনার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের দাবি, প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবার পুলিশকে না জানিয়েই দাফন সম্পন্ন করে। আইনি জটিলতা, ময়নাতদন্ত ও দীর্ঘ প্রক্রিয়া এড়াতে অনেকে দুর্ঘটনার তথ্য গোপন করেন।
বগুড়া সদর ট্রাফিক বিভাগের ইনচার্জ টিআই (প্রশাসন) সালেকুজ্জামান খাঁন বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে ফিটনেসবিহীন যানবাহন, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার, অতিরিক্ত গতি, ট্রাফিক আইন অমান্য এবং চালকদের অসতর্কতা অন্যতম।
তিনি আরও বলেন, মোটরসাইকেল চালকদের মধ্যে অনেকেই হেলমেট ব্যবহার করেন না। আবার বাস ও ট্রাকে অতিরিক্ত যাত্রী ও পণ্য বহনও দুর্ঘটনার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পথচারীদের অসচেতনভাবে রাস্তা পারাপারও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, শুধু আইন প্রয়োগ করলেই হবে না, প্রয়োজন জনসচেতনতা বৃদ্ধি। সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে স্কুল-কলেজ পর্যায় থেকে সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়ানোরও পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) বগুড়া জেলা কমিটির সাবেক সভাপতি ও বর্তমান নির্বাহী সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মাছুদার রহমান হেলাল বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কঠোর আইন প্রয়োগ জরুরি। পাশাপাশি চালকদের প্রশিক্ষণ, যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করা এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্ঘটনা কমাতে শুধু প্রশাসনের পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। সাধারণ মানুষকেও ট্রাফিক আইন মেনে চলতে হবে। হেলমেট ব্যবহার, নির্ধারিত গতিসীমা মানা এবং দায়িত্বশীলভাবে গাড়ি চালানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে অনেক প্রাণহানি রোধ করা সম্ভব।
কসমিক ডেস্ক