অতিবৃষ্টি, কালবৈশাখী ঝড় এবং পাহাড়ি ঢলের পানিতে দেশের অন্যতম বৃহৎ হাকালুকি হাওরে বোরো ধান ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানির নিচে ডুবে যাওয়া আধাপাকা ধান সংগ্রহ করতে গিয়ে চরম সংকটে পড়েছেন হাজারো কৃষক। অনেকেই বছরের পরিশ্রমের ফসল হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, হাওরের তীরবর্তী কুলাউড়া উপজেলার ভূকশিমইল, জয়চন্ডী, কাদিপুর, বরমচাল, ভাটেরা ও ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। প্রায় অর্ধ শতাধিক গ্রামের প্রায় তিন হাজার কৃষকের বোরো ধান ক্ষতির মুখে পড়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
কৃষকরা জানান, টানা বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলের কারণে হঠাৎ করে পানি বৃদ্ধি পায়। ফলে অনেকের কাটা ধান পানির নিচে চলে যায়, আবার অনেকের আধাপাকা ধান নষ্ট হয়ে যায়। কেউ কেউ নৌকা ও কলাগাছের ভেলায় করে ধান সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। তবে অধিকাংশ ধানই এখন পচে যেতে শুরু করেছে।
মীরশংকর গ্রামের কৃষক মান্নান মিয়া ও কাদিপুরের মতু মিয়াসহ অনেকেই জানান, তারা এক সপ্তাহ আগে ধান কেটে স্তুপ করে রেখেছিলেন। কিন্তু মাড়াইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় মেশিন বা শ্রমিক সময়মতো না পাওয়ায় ধান নষ্ট হয়ে গেছে। আবার হঠাৎ পানির চাপ বেড়ে যাওয়ায় সেই স্তুপও তলিয়ে গেছে।
কৃষকদের অভিযোগ, জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে সময়মতো হারভেস্টার মেশিন ব্যবহার করা যায়নি। ফলে শ্রমিক দিয়ে ধান কাটার খরচও বেড়ে গেছে। বর্তমানে এক বিঘা ধান কেটে বাড়ি পৌঁছাতে ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। অথচ বাজারে ধানের দাম মণপ্রতি ৯০০ থেকে ১০০০ টাকার মধ্যে থাকায় অনেকেই লোকসানের মুখে পড়েছেন।
হাওরাঞ্চলের বিভিন্ন গ্রাম যেমন সাদিপুর, কোরবানপুর, মীরশংকর, কাদিপুর, বড়দল, মিঠুপুর, দূর্গাপুর, ভৈরব বাজার, গৌরিশংকর, শ্রীপুরসহ বহু এলাকায় একই চিত্র দেখা গেছে। কৃষকদের মুখে এখন শুধু হতাশা আর অনিশ্চয়তা।
অনেক কৃষক জানিয়েছেন, তাদের কাছে বছরের একমাত্র ফসল বোরো ধানই পরিবারের খাদ্যের প্রধান উৎস। কিন্তু এবার প্রাকৃতিক দুর্যোগে সেই ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় অনেক পরিবার খাদ্য সংকটে পড়ার আশঙ্কা করছে।
কৃষকরা দাবি করেছেন, আগাম বন্যা থেকে ফসল রক্ষায় সরকারকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। তারা মনে করেন, সঠিক পরিকল্পনা ও দ্রুত পদক্ষেপ থাকলে এমন ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
কুলাউড়া উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, এবার উপজেলায় মোট ৮ হাজার ৭২০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছিল। এর মধ্যে হাওর এলাকায় ছিল ৪ হাজার ৮০৫ হেক্টর জমি। অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে অন্তত ৩৮০ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কৃষি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত প্রায় ৮০ শতাংশ ধান সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে, তবে অনেক এলাকায় এখনো আধাপাকা ধান পানির নিচে রয়েছে। এসব ধান দ্রুত সংগ্রহের জন্য প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ কাজ করছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, হাওর অঞ্চলের কৃষকরা প্রতি বছরই প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে পড়ছেন, তাই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান প্রয়োজন।
এদিকে উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে এবং সরকারি সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি সরকারি মূল্যে ধান সংগ্রহ কার্যক্রমও শুরু হয়েছে, যাতে কৃষকরা কিছুটা হলেও ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারেন।
হাকালুকি হাওরের এই পরিস্থিতি আবারও প্রমাণ করেছে যে, প্রকৃতির অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করেই বেঁচে থাকে হাওরাঞ্চলের কৃষকরা। তাদের স্বপ্ন যেমন পানিতে ভেসে গেছে, তেমনি নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর আশাও এখনো বেঁচে আছে।