বাংলাদেশের পর্বতারোহণ ইতিহাসে নতুন এক মাইলফলক স্থাপন করেছেন ডা. বাবর আলী। তিনি প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে বিশ্বের পঞ্চম উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট মাকালু জয় করে অনন্য কৃতিত্ব অর্জন করেছেন। বাংলাদেশ সময় ভোর ৫টা ৪৫ মিনিটে তিনি এই শৃঙ্গে পৌঁছান, যা তার পঞ্চম আট-হাজারি পর্বত জয়।
নেপালের মহালাঙ্গুর হিমালয় অঞ্চলে অবস্থিত মাকালুর উচ্চতা ৮ হাজার ৪৮৫ মিটার (২৭ হাজার ৮৩৮ ফুট)। এই পর্বতটি ‘গ্রেট ব্ল্যাক ওয়ান’ বা ‘মহা-কালো’ নামেও পরিচিত। অত্যন্ত দুর্গম ও বিপজ্জনক এই শৃঙ্গ জয় করা যে কোনো পর্বতারোহীর জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হয়। সেই চ্যালেঞ্জ সফলভাবে অতিক্রম করে বাবর আলী দেশের জন্য নতুন ইতিহাস লিখেছেন।
শিখর অভিযানে তার সঙ্গে ছিলেন অভিজ্ঞ শেরপা আং কামি শেরপা, যিনি পুরো অভিযানে তাকে সহায়তা করেন। এই সফল অভিযানের পেছনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা ছিল, যার মধ্যে রয়েছে ভিজুয়াল নিটওয়ারস লিমিটেড, সামুদা স্পেক-কেম লিমিটেড, মাই হেলথ, চন্দ্রবিন্দু প্রকাশন এবং রহমান্স গ্রোসারিজ।
‘এক্সপিডিশন মাকালু: দ্য ফিফথ ফ্রন্টিয়ার’ শীর্ষক এই অভিযানের আয়োজন করে পর্বতারোহণ ক্লাব ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স। ক্লাবটির সভাপতি ফরহান জামান অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এছাড়া নেপালের আউটফিটার মাকালু অ্যাডভেঞ্চার-এর সহায়তায় অভিযানটি সম্পন্ন হয়।
অভিযানের প্রস্তুতি শুরু হয় ৭ এপ্রিল, যখন বাবর আলী বাংলাদেশ থেকে যাত্রা করেন। ৯ এপ্রিল তিনি বিমানে করে পৌঁছান টুমলিংটার এবং সেখান থেকে সড়কপথে যান সেদুয়া গ্রামে। এরপর শুরু হয় তার পায়ে হেঁটে দীর্ঘ ও কঠিন যাত্রা।
১৮ এপ্রিল তিনি পৌঁছান মাকালুর উচ্চতর বেস ক্যাম্পে। উচ্চতার সঙ্গে শরীর মানিয়ে নেওয়ার জন্য (অ্যাক্লিমাটাইজেশন) তিনি ধাপে ধাপে বিভিন্ন ক্যাম্পে ওঠানামা করেন। ২১ এপ্রিল ক্যাম্প-১ এবং পরদিন ক্যাম্প-২-এ অবস্থান করে তিনি প্রায় ৭ হাজার মিটার উচ্চতা স্পর্শ করেন। পরে আবার বেস ক্যাম্পে ফিরে আসেন।
দ্বিতীয় ধাপে ২৭ এপ্রিল আবার তিনি পর্বতে আরোহণ শুরু করেন এবং ক্যাম্প-২ পর্যন্ত উঠে একদিন অবস্থান করে পুনরায় বেস ক্যাম্পে ফিরে আসেন। এরপর শুরু হয় অনুকূল আবহাওয়ার জন্য অপেক্ষা।
অবশেষে ৩০ এপ্রিল আবহাওয়া অনুকূলে এলে তিনি আবার আরোহণ শুরু করেন। সেদিন তিনি সরাসরি ৬ হাজার ৬০০ মিটার উচ্চতার ক্যাম্প-২-এ পৌঁছান। পরদিন উঠে যান ৭ হাজার ৪০০ মিটার উচ্চতার ক্যাম্প-৩-এ। সেখানে কিছু সময় বিশ্রাম নিয়ে গভীর রাতে শুরু হয় তার চূড়ান্ত শিখর অভিযান।
প্রায় ১১শ মিটারের বেশি খাড়া ও বিপজ্জনক চড়াই অতিক্রম করে তিনি ভোরে পৌঁছে যান মাকালুর চূড়ায়। এই সাফল্যের মাধ্যমে তিনি শুধু নিজের ব্যক্তিগত অর্জনই নয়, বরং বাংলাদেশের পতাকাকে বিশ্ব পর্বতারোহণের উচ্চতম মঞ্চে তুলে ধরেছেন।
এই অর্জন দেশের পর্বতারোহণ অঙ্গনে নতুন অনুপ্রেরণা জোগাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তরুণ প্রজন্মের জন্য এটি একটি উদাহরণ হয়ে থাকবে যে, দৃঢ় সংকল্প ও পরিশ্রম থাকলে বিশ্বমানের চ্যালেঞ্জও জয় করা সম্ভব।
কসমিক ডেস্ক