বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখকে ঘিরে সারা দেশের মতো নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলাতেও শুরু হয়েছে উৎসবের প্রস্তুতি। বিশেষ করে স্থানীয় মৃৎশিল্পীরা এখন ভীষণ ব্যস্ত সময় পার করছেন।
উপজেলার মোজাফরপুর ও বলাইশিমুল ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে দেখা গেছে, মাটির তৈরি বিভিন্ন পণ্য রঙ করে শুকাতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন মৃৎশিল্পীরা। বৈশাখী মেলায় এসব পণ্যই প্রধান আকর্ষণ হিসেবে থাকে।
লস্করপুর ও গগডা গ্রামের কয়েকটি পরিবার দীর্ঘদিন ধরে এই ঐতিহ্যবাহী পেশার সঙ্গে যুক্ত। তারা মাটি দিয়ে তৈরি করছেন খেলনা, পুতুল, ব্যাংক, ঘোড়া, হাতি, কলসি, ফুলদানি, থালা-বাটি এবং গৃহসজ্জার নানা সামগ্রী।
স্থানীয় মৃৎশিল্পীরা জানান, সারা বছর এই পেশায় তেমন আয় না থাকলেও পহেলা বৈশাখ, দুর্গাপূজা ও স্থানীয় মেলাগুলো তাদের জন্য বড় সুযোগ নিয়ে আসে। এই সময়কে কেন্দ্র করেই তারা পুরো বছরের উৎপাদন পরিকল্পনা করেন।
৬০ বছর বয়সী মৃৎশিল্পী নওমিতা রাণী বলেন, “আমরা বহু বছর ধরে এই কাজ করছি। বৈশাখ, দুর্গাপূজা বা মেলা এলে কাজের চাপ বেড়ে যায়। পরিবারের সবাই মিলে কাজ করি। এটা আমাদের বাপ-দাদার পেশা।”
তিনি আরও জানান, এই শিল্প অত্যন্ত পরিশ্রমসাধ্য হলেও এখনো এটি টিকে আছে ঐতিহ্যের কারণে। তবে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও পর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে অনেক সময় ন্যায্য মূল্য পাওয়া যায় না।
গগডা গ্রামের আরেক মৃৎশিল্পী হরিদাস পাল বলেন, “বর্তমানে প্লাস্টিক পণ্যের কারণে মাটির পণ্যের চাহিদা কমে গেছে। আমরা পরিশ্রম অনুযায়ী দাম পাই না। এই পেশা টিকিয়ে রাখতে সরকারিভাবে সহযোগিতা প্রয়োজন।”
মৃৎশিল্পীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন পণ্যের দাম তুলনামূলকভাবে কম হলেও তা নির্ভর করে আকার ও নকশার ওপর। যেমন থালা ১০০ থেকে ১৫০ টাকা, বাটি ৬০ থেকে ৮০ টাকা, কলসি ৫০ থেকে ২০০ টাকা, পুতুল ৫০ থেকে ১০০ টাকা এবং বড় শৌখিন সামগ্রী ২০০ থেকে ৪৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়।
মাটি সংগ্রহের জন্য তারা স্থানীয় হাওর ও বিল থেকে এঁটেল মাটি সংগ্রহ করেন। এরপর সেই মাটি দিয়ে তৈরি করা হয় বিভিন্ন পণ্য, যা শুকানোর পর রঙ ও বার্নিশ করা হয়।
স্থানীয়রা মনে করছেন, এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প বাঁচিয়ে রাখতে হলে সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি। কারণ নতুন প্রজন্মের অনেকেই এখন এই পেশার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে।
সাবেক ইউপি সদস্য হারিফ উদ্দিন হানিফ বলেন, “মৃৎশিল্প আমাদের সংস্কৃতির জীবন্ত প্রতীক। এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে সহযোগিতা বাড়াতে হবে।”
স্থানীয় সাংবাদিক আবুল কাশেম আকন্দও একই মত প্রকাশ করে বলেন, “সহযোগিতা পেলে এই শিল্প আরও বিস্তৃত হতে পারে এবং পুরনো ঐতিহ্য টিকে থাকবে।”
সব মিলিয়ে বৈশাখকে ঘিরে মৃৎশিল্পীদের ব্যস্ততা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। রঙিন পণ্যে সাজছে তাদের ঘরবাড়ি ও কর্মস্থল, আর সেই সঙ্গে টিকে থাকার লড়াইও চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।
কসমিক ডেস্ক