মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের প্রভাব এবার সরাসরি পড়তে শুরু করেছে China-এর অর্থনীতিতে। দীর্ঘ সময় পর দেশটির শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে, যা নতুন অর্থনৈতিক চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে চীনের উৎপাদক মূল্যসূচক (PPI) আগের বছরের তুলনায় ০.৫ শতাংশ বেড়েছে। এটি গত ৩ বছর ৬ মাসের মধ্যে প্রথমবারের মতো এই সূচকের বৃদ্ধি। এর আগে টানা ৪১ মাস ধরে পিপিআই নিম্নমুখী ছিল, যা শিল্প খাতের দুর্বল চাহিদার প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তনের পেছনে প্রধান কারণ হচ্ছে জ্বালানি ও কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে উৎপাদন ব্যয়ের ওপর। বিশেষ করে জ্বালানি-নির্ভর শিল্পগুলোতে ব্যয় দ্রুত বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম Reuters-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নন-ফেরাস ধাতু ও ধাতু প্রক্রিয়াজাত খাতে সবচেয়ে বেশি মূল্যবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। একই সঙ্গে তেলের দাম বাড়ার ফলে কারখানাগুলোর সামগ্রিক উৎপাদন খরচও বেড়ে গেছে।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, এই ধরনের মূল্যস্ফীতি ‘কস্ট-পুশ ইনফ্লেশন’ হিসেবে পরিচিত, যেখানে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণে পণ্যের দাম বৃদ্ধি পায়, কিন্তু ভোক্তা চাহিদা তেমন বাড়ে না। এতে অর্থনীতির জন্য একটি জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়।
কারণ, যদি উৎপাদন খরচ বাড়লেও ভোক্তা চাহিদা না বাড়ে, তাহলে কোম্পানিগুলো সহজে সেই বাড়তি খরচ বাজারে চাপিয়ে দিতে পারে না। ফলে তাদের মুনাফা কমে যায়, যা বিনিয়োগ কমিয়ে দিতে পারে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও সীমিত করে।
অন্যদিকে, ভোক্তা পর্যায়ের মূল্যস্ফীতি তুলনামূলকভাবে ধীরগতিতে বাড়ছে। মার্চ মাসে চীনের ভোক্তা মূল্যসূচক (CPI) ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আগের মাসের তুলনায় কম। এমনকি মাসভিত্তিক হিসাবে কিছু পণ্যের দাম কমারও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, চীনের অর্থনীতিতে চাপটি মূলত বাইরের উৎস থেকে আসছে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা এখনও দুর্বল রয়েছে এবং বৈদেশিক বাজারেও চাহিদা কমছে। এর প্রভাব ইতোমধ্যে বিভিন্ন খাতে পড়তে শুরু করেছে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গাড়ি বিক্রির খাত। টানা ছয় মাস ধরে চীনে গাড়ি বিক্রি কমছে। জ্বালানির দাম বাড়ায় পেট্রোলচালিত গাড়ির চাহিদা কমেছে। একই সঙ্গে সরকারি প্রণোদনা কমে যাওয়ায় বৈদ্যুতিক গাড়ির বিক্রিও প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না।
এই পরিস্থিতি নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে তারা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে প্রণোদনা দিতে চান, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হচ্ছে সতর্কতা। যদি মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ে, তাহলে বড় ধরনের প্রণোদনা দেওয়া কঠিন হয়ে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে চীন একসঙ্গে দুটি বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে—একদিকে মূল্যস্ফীতি, অন্যদিকে প্রবৃদ্ধির ধীরগতি। এই ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে বড় কাজ।
তেলের দামের প্রভাব কমাতে চীন ইতোমধ্যে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। দেশটির সরকার অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির দামের একটি সীমা নির্ধারণ করেছে, যাতে হঠাৎ করে দাম বেড়ে শিল্প খাতে অতিরিক্ত চাপ না পড়ে।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এখন বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ঢেউ তুলছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে চীনের মতো বড় উৎপাদন অর্থনীতিতেও। আগামী দিনগুলোতে এই পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেয় বেইজিং, সেটিই এখন বিশ্ব অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
কসমিক ডেস্ক