প্রাণিস্বাস্থ্যের সুরক্ষা, খামারিদের জীবিকার নিরাপত্তা এবং পশু-পাখি থেকে মানুষের রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি কমাতে দেশে প্রথমবারের মতো চালু হচ্ছে প্রাণীদের জন্য ‘ভ্যাকসিনেশন কার্ড’ বা টিকাদান কার্ড। এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে আইসিডিডিআরবি ও দেশের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (ডিএলএস)।
এর অংশ হিসেবে বুধবার (৮ এপ্রিল) রাজধানীর একটি হোটেলে ‘অ্যানিমেল ভ্যাকসিনেশন কার্ড’ তৈরির বিষয়ে পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে এই সভা আয়োজন করা হয়। সভায় সরকারি বিশেষজ্ঞ, ইপিআই প্রতিনিধি, ওষুধ শিল্প ও প্রাণিস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন এবং আলোচনার ভিত্তিতে গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি ও পোষা প্রাণীর কার্যকর টিকাদান ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা চূড়ান্ত হয়।
আইসিডিডিআরবি জানায়, বাংলাদেশ সংক্রামক ব্যাধির ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পড়ে। দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ সংক্রামক রোগ প্রাণীবাহিত। জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং মানুষ-প্রাণীর ঘনিষ্ঠ সহাবস্থানের কারণে অ্যানথ্রাক্স, জলাতঙ্ক এবং অ্যাভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো রোগ ছড়ানোর সম্ভাবনা অনেক বেশি। কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ না থাকায় রোগ মোকাবিলা ও নজরদারি করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে।
এ সমস্যা সমাধান করতে, গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি ও পোষা প্রাণীর জন্য আলাদা টিকাদান কার্ড তৈরি করা হচ্ছে। এই কার্ডের মাধ্যমে প্রাণীর পরিচয়, টিকাদানের ইতিহাস ও পরবর্তী টিকার সময়সূচি লেখা হবে। ফলে সঠিক ট্র্যাকিং এবং সমন্বয় সহজ হবে, যা প্রাণীর মৃত্যুহার কমাবে, চিকিৎসার খরচ কমাবে এবং উৎপাদনশীলতা বাড়াবে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) বয়জার রহমান বলেন, “প্রাণীদের জাতীয় টিকাদান সক্ষমতা মাত্র ১০ শতাংশের কাছাকাছি। যদি টিকাদান ব্যবস্থা শক্তিশালী না হয়, তাহলে প্রাণিসম্পদ খাত তার পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারবে না।”
বাংলাদেশে প্রাণিসম্পদ ও পোল্ট্রি খাতের জিডিপিতে প্রায় ১.৮১ শতাংশ অবদান রয়েছে এবং প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ সরাসরি এই খাতের সঙ্গে জড়িত। তবে গ্রামীণ খামারিদের মধ্যে নিয়মিত টিকাদানের হার মাত্র ২০ শতাংশ।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, “সম্প্রতি বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব আমাদের শিখিয়েছে যে টিকাদানের ঘাটতি মানুষ ও প্রাণী উভয়ের স্বাস্থ্যকে ঝুঁকিতে ফেলে। প্রাণীদের টিকা মানে শুধু তাদের রক্ষা করা নয়, পরিবেশ, খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যকেও রক্ষা করা।”
আইসিডিডিআরবির গবেষক ড. সুকান্ত চৌধুরী বলেন, “নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে খামারিরা সহজে টিকার হিসাব রাখতে পারবেন, যা তাদের প্রাণীর রোগ প্রতিরোধে সহায়ক হবে। এটি শেষ পর্যন্ত খামারি ও ভোক্তা উভয়কেই লাভবান করবে।”
এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের প্রাণিসম্পদ খাতের কার্যকর টিকাদান ব্যবস্থা শক্তিশালী হবে এবং প্রাণী ও মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
কসমিক ডেস্ক