ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফশিল ঘোষণার পরবর্তী ৩৬ দিনে দেশে অন্তত ১৫ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। নির্বাচনি পরিবেশে সহিংসতা, রাজনৈতিক হয়রানি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে বড় উদ্বেগ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীতে টিআইবির কার্যালয়ে আয়োজিত ‘কর্তৃত্ববাদ পতন–পরবর্তী দেড় বছর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচনের প্রাক্কালে সম্ভাব্য প্রার্থী ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর হামলা, নির্বাচনি সহিংসতা এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আক্রমণের ঘটনা নির্বাচনি পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। টিআইবির মতে, এসব বিষয় গণতান্ত্রিক ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য বড় অন্তরায়।
টিআইবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সারাদেশে ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১০২ জন। একই সময়ে এক হাজার ৩৩৩টি অস্ত্র নিখোঁজ হওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। পাশাপাশি ডিপফেক ও ভুয়া তথ্য ছড়ানোর ঝুঁকি এবং সংখ্যালঘুদের ওপর ৫০টির বেশি হামলার ঘটনা নির্বাচনি পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়, বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র এখনো উদ্ধার না হওয়া এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নতুন করে অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ সহিংসতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। নির্বাচনি দায়িত্বে থাকা জনবলের মধ্যে মাত্র ৯ থেকে ১০ শতাংশ পুলিশ সদস্য থাকায় সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ঘাটতি রয়ে গেছে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
টিআইবির পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বদলি—বিশেষ করে আগের তিনটি নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের বাদ দেওয়া—নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। উপদেষ্টাদের দলীয়করণ ও নিরপেক্ষতা নিয়েও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সন্দেহ ও মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলনের মতো দলগুলো সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত না হওয়ার অভিযোগ তুলেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৪৬টি আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ নিয়ে উচ্চ আদালতে অন্তত ২৭টি রিট আবেদন করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ১২ হাজার ৫৩১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্র হিসেবে উপযুক্ত নয় বলেও উল্লেখ করা হয়।
নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য নির্বাচন কমিশন প্রাথমিকভাবে যে ৭৩টি সংস্থাকে বাছাই করেছে, সেগুলোর অনেকগুলোর সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে টিআইবি। প্রার্থীদের মনোনয়ন যাচাই, ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগে প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষেত্রে কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েও রাজনৈতিক দলগুলোর অভিযোগ রয়েছে।
টিআইবির বিশ্লেষণে বলা হয়, প্রায় সব বড় রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধেই আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। কিছু ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও কঠোর প্রয়োগের অভাবে অনিয়ম পুরোপুরি রোধ করা সম্ভব হয়নি।
প্রতিবেদনটি উপসংহারে বলেছে, নির্বাচন ও গণভোট ব্যবস্থায় প্রযুক্তি, আইন ও প্রক্রিয়াগত বড় ধরনের সংস্কার জরুরি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে অপতথ্য ছড়ানো ও নিরাপত্তা ঝুঁকি ভবিষ্যতের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। নানা অস্থিরতা ও অসুস্থ প্রতিযোগিতা সত্ত্বেও নির্বাচনি পরিবেশ এখনো আংশিকভাবে সক্রিয় রয়েছে বলে মন্তব্য করেছে সংস্থাটি।
কসমিক ডেস্ক