নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর এক মাস পেরিয়ে গেলেও সারাদেশে এখনো ৩০ লাখের বেশি পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছায়নি। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) ভেতরে গড়ে ওঠা কর্মকর্তা ও নির্দিষ্ট কিছু ছাপাখানার সিন্ডিকেটের কারণে বই ছাপা ও বিতরণে এই সংকট তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
যদিও এনসিটিবির পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, এ বছর আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় দ্রুত বই বিতরণ করা হয়েছে। তবে বই ছাপার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, এনসিটিবির এই দাবি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাদের মতে, যেসব বছরে বই বিতরণে বড় ধরনের বিলম্ব হয়েছে, সেসব বছরে বড় কোনো সংকট বা অস্বাভাবিক কারণ ছিল। চলতি বছর তেমন কোনো বড় কারণ না থাকলেও বই বিতরণে ঘাটতি রয়ে গেছে।
এনসিটিবির বিতরণ শাখার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার রাত পর্যন্ত মাধ্যমিক স্তরের জন্য ছাপা ৩০ কোটি ২ লাখ ৩৯ হাজার ৬৫৩ কপি পাঠ্যবইয়ের বিপরীতে উপজেলা পর্যায়ে বিতরণ হয়েছে ২৯ কোটি ৭১ লাখ ৮০ হাজার ৮৫৯ কপি। অর্থাৎ এখনো বিতরণ বাকি রয়েছে ৩০ লাখ ৫৮ হাজার ৭৯৪ কপি বই। এ হিসাবে সামগ্রিক বিতরণ হার ৯৮ দশমিক ৯৮ শতাংশ।
তবে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক (সাধারণ) স্তরে শতভাগ পাঠ্যবই বিতরণ সম্পন্ন হলেও মাধ্যমিক স্তরে পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ ছিল ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণিতে। ষষ্ঠ শ্রেণিতে প্রায় ৯৯ শতাংশ বই সরবরাহ করা হলেও সপ্তম শ্রেণিতে এখনও প্রায় ৫ শতাংশ এবং অষ্টম শ্রেণিতে ৩ শতাংশ শিক্ষার্থী পাঠ্যবই পায়নি।
বই ছাপার এই সংকটের পেছনে এনসিটিবির সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান অধ্যাপক রবিউল কবির চৌধুরী এবং বর্তমান সদস্য রিয়াদ চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেটকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ নির্দিষ্ট কিছু প্রেসকে কাজ পাইয়ে দিতে দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়ম করা হয়েছে।
এর আগে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির প্রায় ৬০৩ কোটি টাকার দরপত্র বাতিলের পর পুনরায় টেন্ডার হলে ‘প্রিন্ট মাস্টার’ ও ‘মাস্টার সিমেক্স’ নামের দুটি প্রতিষ্ঠান প্রাক্কলিত মূল্যের চেয়ে প্রায় ৪৫ শতাংশ কম দরে কাজ পায়। অভিযোগ রয়েছে, এই দুই প্রেস নিম্নমানের কাগজে ছাপা বই সরবরাহ করলেও সহজেই ছাড়পত্র পায়। বিপরীতে অন্য মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নানা অজুহাতে কঠোরতা দেখানো হয়।
এই বৈষম্যের কারণে বই ছাপার স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয় এবং বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের হাতে মানসম্মত পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়ার সরকারি লক্ষ্য বাস্তবায়ন ব্যর্থ হয় বলে অভিযোগ।
এনসিটিবির অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির বইয়ের দরপত্রে অনিয়মের অভিযোগে সদস্য রিয়াদ চৌধুরীকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও তিনি কৌশলে পদে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন। তিনি নিজেই জানিয়েছিলেন, চলতি বছরের বই ছাপার কাজ শেষ হলে ১৫ জানুয়ারির মধ্যে দায়িত্ব ছাড়বেন। তবে জানুয়ারি শেষ হলেও তিনি এখনও পদে বহাল আছেন। অভিযোগ উঠেছে, সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠান ‘মাস্টার সিমেক্স’ তাকে পদে রাখতে পর্দার আড়ালে তৎপরতা চালাচ্ছে।
এ বিষয়ে এনসিটিবির চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মাহবুবুল হক পাটওয়ারী বলেন, শিক্ষার্থীদের হাতে ১ জানুয়ারির মধ্যে বই পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করা হয়েছিল। পরে ১৫ জানুয়ারি নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও নানা কারণে সেটিও পূরণ করা সম্ভব হয়নি।
কসমিক ডেস্ক