সরকারি চাকরিজীবীদের পেনশন সুবিধা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। চাকরির ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে কোনো সরকারি কর্মচারী পদত্যাগ করলে তিনি পেনশন বা সংশ্লিষ্ট অবসর-সুবিধার অধিকারী হবেন না বলে পূর্ণাঙ্গ রায়ে জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।
গত ৯ জুলাই বিচারপতি মো. রেজাউল হক-এর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের তিন সদস্যের বেঞ্চ এ রায় দেন। বেঞ্চের অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি এস এম এমদাদুল হক এবং বিচারপতি ফারাহ মাহবুব।
২৮ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত বলেন, আইনপ্রণেতারা যুক্তিসংগত বিবেচনায় সরকারি কর্মচারীদের জন্য ২৫ বছরের যোগ্যতাসম্পন্ন চাকরির মেয়াদ নির্ধারণ করেছেন। এই সময়সীমা পূর্ণ হওয়ার আগে কেউ স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলে তাকে পেনশন সুবিধা দেওয়ার কোনো বিধান বিদ্যমান আইনে নেই।
মামলাটির সূত্রপাত হয় ২০২১ সালের ১৮ মার্চ হাইকোর্টের দেওয়া একটি রায়কে কেন্দ্র করে। সে সময় হাইকোর্ট সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহবুব মোরশেদকে চাকরিজীবনের মেয়াদের ভিত্তিতে পেনশন এবং অন্যান্য বকেয়া সুবিধা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ওই রায়ের বিরুদ্ধে আইন মন্ত্রণালয় আপিল করলে বিষয়টি আপিল বিভাগের বিচারাধীন হয়।
মামলার তথ্য অনুযায়ী, মো. মাহবুব মোরশেদ ১৯৯১ সালের ডিসেম্বর মাসে সহকারী জজ হিসেবে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসে যোগ দেন। পরে অতিরিক্ত জেলা জজ হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে প্রায় ১৯ বছর চাকরি শেষে ২০১১ সালের ৩১ জানুয়ারি পদত্যাগ করেন। চাকরির মেয়াদ ২৫ বছর পূর্ণ না হওয়ায় তার পেনশন পাওয়ার অধিকার রয়েছে কি না, সেটিই ছিল মামলার মূল প্রশ্ন।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে আপিল বিভাগ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী বাধ্যতামূলক যোগ্যতার মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগে পদত্যাগকারী কোনো সরকারি কর্মচারীকে পেনশন দেওয়ার সুযোগ নেই। ফলে হাইকোর্ট যে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তা আইনগতভাবে কার্যকরযোগ্য নয়।
আদালত আরও বলেন, আইন মন্ত্রণালয়কে মাহবুব মোরশেদকে পেনশন দেওয়ার যে নির্দেশ হাইকোর্ট দিয়েছিলেন, সেটিও টেকসই নয়। কারণ, আইন এ ধরনের সুবিধা দেওয়ার অনুমোদন দেয় না এবং আদালত আইনবহির্ভূত কোনো সুবিধা প্রদানের নির্দেশ দিতে পারেন না।
রায়ে বিচারপতিরা সরকারি চাকরির নীতিগত দিকও তুলে ধরেন। তারা বলেন, সরকারি চাকরি কেবল একটি স্বল্পমেয়াদি কর্মসংস্থান নয়; বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব, জবাবদিহি, ধারাবাহিকতা এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি কাঠামোবদ্ধ পেশা।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে আরও বলা হয়, যদি নির্ধারিত ২৫ বছরের চাকরির মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই পেনশন ও অবসর-সুবিধা গ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে অনেক কর্মকর্তা সরকারি চাকরিকে কেবল অভিজ্ঞতা অর্জন, প্রশিক্ষণ বা ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার একটি অস্থায়ী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। পরবর্তীতে তারা অন্য সুযোগের জন্য চাকরি ছেড়ে যেতে উৎসাহিত হতে পারেন।
আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে সরকারি প্রতিষ্ঠানে দক্ষ জনবল ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে, জনবল পরিকল্পনা ব্যাহত হবে এবং সরকারি চাকরির শৃঙ্খলা, স্থিতিশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এই রায়ের মাধ্যমে আপিল বিভাগ স্পষ্ট করেছে যে, সরকারি কর্মচারীদের পেনশন সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে ২৫ বছরের যোগ্যতাসম্পন্ন চাকরির মেয়াদ পূর্ণ করা একটি বাধ্যতামূলক আইনি শর্ত, এবং বিদ্যমান আইন পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত এর ব্যতিক্রমের সুযোগ নেই।
কসমিক ডেস্ক