মুক্তিযুদ্ধ-গণতন্ত্র ও আইনের প্রাজ্ঞ এক অভিভাবকের বিদায় The Daily Cosmic Post
ঢাকা | বঙ্গাব্দ
ঢাকা |

মুক্তিযুদ্ধ-গণতন্ত্র ও আইনের প্রাজ্ঞ এক অভিভাবকের বিদায়

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Jul 12, 2026 ইং
মুক্তিযুদ্ধ-গণতন্ত্র ও আইনের প্রাজ্ঞ এক অভিভাবকের বিদায় ছবির ক্যাপশন:

বাংলাদেশের রাজনীতি, আইন ও সংসদীয় গণতন্ত্রের এক প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিত্ব ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার আর নেই। ২০২৬ সালের ১২ জুলাই ৯৪ বছর বয়সে রাজধানীর একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। দীর্ঘ রাজনৈতিক, আইনি ও রাষ্ট্রীয় জীবনে তিনি একজন দক্ষ আইনজীবী, সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা, শিক্ষাবিদ ও অভিজ্ঞ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।

১৯৩১ সালের ১ ডিসেম্বর পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার নয়াবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন জমির উদ্দিন সরকার। শিক্ষাজীবনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে বিএ (অনার্স) ও এমএ এবং পরে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যে গিয়ে লন্ডনের ঐতিহ্যবাহী লিংকনস ইন থেকে ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল ডিগ্রি লাভ করেন। লন্ডনে অবস্থানকালে ছাত্ররাজনীতি ও প্রগতিশীল আন্দোলনের সঙ্গেও তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন।

১৯৬০ সালে আইন পেশায় যোগ দিয়ে তিনি পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্ট এবং পরে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টে সংবিধান, দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনের একজন খ্যাতিমান আইনজীবী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। পাশাপাশি সমুদ্র আইন, আন্তর্জাতিক আইন, পরিবেশ আইন ও শিল্প-বাণিজ্য সংক্রান্ত জটিল আইনি বিষয়ে তাঁর বিশেষ দক্ষতা ছিল। বাংলাদেশের সামুদ্রিক সীমানা ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে তাঁর অবদানও উল্লেখযোগ্য।

মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেওয়া সাহসী আইনজীবীদের অন্যতম ছিলেন। আইনজীবীদের একটি ছোট কিন্তু সক্রিয় দলের সদস্য হিসেবে তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন ও আইনি সহায়তা প্রদানে ভূমিকা রাখেন।

রাজনীতিতে তাঁর যাত্রা শুরু হয় ছাত্রজীবনে। ছাত্র ফেডারেশন, ছাত্র ইউনিয়ন এবং ন্যাপের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার পর তিনি আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হন এবং মাওলানা ভাসানীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। পরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল)-এর গঠনতন্ত্র প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৭৮ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠার সময় তিনি দলের প্রতিষ্ঠাতা স্থায়ী কমিটির সদস্য হন।

ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার পাঁচবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি গণপূর্ত ও নগর উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী, ভূমি প্রতিমন্ত্রী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এবং আইনমন্ত্রীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে তাঁর সময়েই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-১৯৯২ এবং বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আইন-১৯৯২ প্রণয়ন করা হয়। তাঁর তত্ত্বাবধানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) প্রতিষ্ঠার কাজও এগিয়ে যায়। শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারণে তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে স্মরণীয়।

অষ্টম জাতীয় সংসদে তিনি স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০২ সালে সংবিধান অনুযায়ী কয়েক মাসের জন্য ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বও পালন করেন। সংসদ পরিচালনায় নিরপেক্ষতা, শালীনতা ও সাংবিধানিক রীতিনীতির প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা তাঁকে দল-মত নির্বিশেষে সম্মানিত ব্যক্তিত্বে পরিণত করে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তাঁর অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তাঁকে একাধিকবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে পাঠান। সেখানে তিনি আন্তর্জাতিক আইন, সামুদ্রিক অধিকার এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

রাজনীতি ও আইনচর্চার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন লেখক। গণতন্ত্র, সংসদীয় ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক আইন, সমুদ্র আইন এবং রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে তাঁর রচিত একাধিক গ্রন্থ গবেষক, শিক্ষার্থী ও আইনজীবীদের কাছে মূল্যবান তথ্যসূত্র হিসেবে বিবেচিত হয়।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি সংলাপ, গণতান্ত্রিক চর্চা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা এবং আইনের শাসনের পক্ষে ধারাবাহিকভাবে মত প্রকাশ করেছেন। ব্যক্তিজীবনে তাঁর সাদাসিধে জীবনযাপন, শালীন আচরণ এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতিও সৌজন্যমূলক মনোভাব তাঁকে একজন সম্মানিত অভিভাবকের মর্যাদা দিয়েছে।

ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন, আইনজীবী সমাজ, শিক্ষাবিদ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাঁর দীর্ঘ কর্মময় জীবন বাংলাদেশের গণতন্ত্র, আইন ও রাষ্ট্র পরিচালনার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : কসমিক ডেস্ক

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
ধলাই নদীর বাঁধ ভেঙে মৌলভীবাজারে প্লাবিত ৭-১০ গ্রাম

ধলাই নদীর বাঁধ ভেঙে মৌলভীবাজারে প্লাবিত ৭-১০ গ্রাম