শিশুশ্রম নির্মূলে শুধু আলোচনা বা সেমিনার আয়োজন যথেষ্ট নয়, বরং বাস্তবমুখী ও টেকসই উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি বলেছেন, শিশুশ্রম বন্ধের কাজ শুরু করতে হবে নিজের পরিবার ও আশপাশের পরিবেশ থেকেই।
সোমবার (২৯ জুন) রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘শিশুশ্রমকে না বলি, শোভন কর্ম পরিবেশ নিশ্চিত করি’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
মন্ত্রী বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় এখনও শিশুশ্রমের প্রবণতা বিদ্যমান রয়েছে। বিশেষ করে বস্তি ও সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলের শিশুদের জন্য সচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। একটি শিশু সঠিকভাবে বেড়ে উঠছে কি না, তা নিশ্চিত করা সমাজের সবার দায়িত্ব বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)সহ দেশি-বিদেশি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রতি আহ্বান জানান, তারা যেন শিশুশ্রমপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সমন্বিতভাবে কাজ করে। এর মাধ্যমে সমস্যার মূল জায়গাগুলোতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে।
আরিফুল হক চৌধুরী আরও বলেন, মানবসম্পদ একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। এই সম্পদকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হলে শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। শিশুশ্রমের কারণে তারা তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়, যা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্যও বাধা।
তিনি আগামী এক বছরের মধ্যে একটি কার্যকর পাইলট প্রোগ্রাম বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন। এই কর্মসূচির মাধ্যমে কত শতাংশ শিশুকে শ্রম থেকে ফিরিয়ে এনে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে, তা পর্যালোচনা করা হবে বলে জানান তিনি। বক্তৃতায় দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ দেওয়াই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মন্তব্য করেন মন্ত্রী।
শিশুশ্রম প্রতিরোধে গণসচেতনতা বাড়াতে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পৃক্ততার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন তিনি। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে দেশের মসজিদগুলোতে জুমার খুতবায় শিশুশ্রমের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরা যেতে পারে বলে তিনি মত দেন। একইভাবে অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান—যেমন মন্দির, গির্জা ও বৌদ্ধ বিহারেও এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে শিশুশ্রমের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরা হয়। এতে এ খাতে দেশের অর্জনের পাশাপাশি বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলোও তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি শিশুদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আব্দুর রহমান তারফদার। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আইএলও বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স টুননসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুশ্রম নির্মূল করতে হলে শুধু আইন প্রণয়ন নয়, তার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব।
সব মিলিয়ে, শিশুশ্রম নির্মূলের জন্য একটি সমন্বিত ও টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর জোর দিয়েছেন শ্রমমন্ত্রী। তার মতে, পরিবার থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে।
কসমিক ডেস্ক