দূর থেকে দেখলে মনে হবে আধুনিক কোনো সেতু। লোহার কাঠামো আর কংক্রিটের অংশ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দৃঢ়ভাবে। কিন্তু কাছে গেলেই ধরা পড়ে বাস্তবতা। সেতুর দুই পাশে নেই কোনো সংযোগ সড়ক। ফলে কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই অবকাঠামো এখন প্রায় অকেজো। চট্টগ্রামের পটিয়া ও আনোয়ারা উপজেলার সংযোগস্থলে অবস্থিত সেতুটি ব্যবহার করতে স্থানীয়দের ভরসা করতে হচ্ছে বাঁশ ও কাঠের তৈরি ঝুঁকিপূর্ণ অস্থায়ী পথের ওপর।
স্থানীয়দের ভাষায়, এটি এখন আর সেতু নয়, বরং অবহেলা ও পরিকল্পনাহীনতার প্রতীক। প্রতিদিন শত শত মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাঁশের সাঁকো পার হয়ে গন্তব্যে পৌঁছাচ্ছেন। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, নারী, বৃদ্ধ ও অসুস্থ রোগীদের জন্য এই পথ হয়ে উঠেছে আতঙ্কের নাম।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ২০০৬ সালে সেতুটি নির্মাণ করা হয়। তবে নির্মাণের পর থেকেই সংযোগ সড়ক না থাকায় এটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় সেতুর দুই প্রান্তে আগাছা ও ঝোপঝাড় জন্মেছে। বর্তমানে স্থানীয়দের উদ্যোগে তৈরি বাঁশের সরু পথই একমাত্র চলাচলের মাধ্যম।
“সেতু আছে, রাস্তা নেই”
স্থানীয় দোকানদার আবুল কাশেম বলেন,
“সেতু বানাইছে প্রায় বিশ বছর আগে। কিন্তু রাস্তা না থাকায় মানুষ কোনো উপকার পাইতেছে না। বর্ষাকালে বাঁশের পথ পিচ্ছিল হয়ে যায়, তখন আরও ভয় লাগে। সরকার যদি রাস্তা করে দিত, তাহলে এলাকার মানুষের অনেক সুবিধা হতো।”
স্থানীয় কৃষক নুরুল আলম বলেন,
“আমাদের কৃষিপণ্য বাজারে নিতে অনেক কষ্ট হয়। সেতুটা চালু থাকলে সময় ও খরচ দুইটাই কমতো। এখন ঘুরে যেতে হয় কয়েক কিলোমিটার পথ।”
স্থানীয় বাসিন্দা সালমা বেগম জানান,
“কোনো রোগী অসুস্থ হলে তাকে এই বাঁশের পথ দিয়ে নিতে খুব কষ্ট হয়। অনেক সময় লোকজন ধরে ধরে পার করাতে হয়। রাতের বেলা তো আরও ভয়ঙ্কর অবস্থা।”
একজন স্কুলশিক্ষক বলেন,
“প্রতিদিন শিক্ষার্থীরা এই পথ দিয়ে যাতায়াত করে। যে কোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। অথচ পাশে কোটি টাকার সেতু দাঁড়িয়ে আছে।”
আশিয়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নিকাশ বড়ুয়া বলেন,
“সেতুর দুই পাশে সংযোগ সড়ক নির্মাণ অত্যন্ত জরুরি। আমরা একাধিকবার উপজেলা প্রশাসন ও প্রকৌশল বিভাগকে বিষয়টি জানিয়েছি। স্থানীয় মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তি পোহাচ্ছে। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।”
তিনি আরও বলেন,
“একটি সেতু নির্মাণ করে বছরের পর বছর ফেলে রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। জনগণের টাকার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে।”
পটিয়া উপজেলা প্রকৌশল অফিসের কর্মকর্তা জানান,
“সেতুটি সংস্কার এবং দুই পাশে সংযোগ সড়ক নির্মাণের জন্য পৃথক দুটি প্রকল্প ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে দ্রুত টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে কাজ শুরু করা হবে।”
তবে কবে নাগাদ কাজ শুরু হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাতে পারেননি তিনি।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, দুই উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় সেতুটি দীর্ঘদিন প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার শিকার হয়েছে। ফলে প্রায় দুই দশক ধরে জনগণের কোনো কাজে আসছে না এই অবকাঠামো।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মোহাম্মদ হানিফ বলেন,
“এটা উন্নয়নের নয়, অপচয়ের উদাহরণ। কোটি টাকা খরচ করে সেতু বানানো হয়েছে, কিন্তু মানুষ এখনও বাঁশের সাঁকো দিয়ে চলাফেরা করে। এর চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে?”
এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত সংযোগ সড়ক নির্মাণ করে সেতুটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হোক। অন্যথায় কোটি টাকার এই অবকাঠামো ভবিষ্যতেও কেবল অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার স্মারক হিসেবেই দাঁড়িয়ে থাকবে।