ঢাকার যানজট নিরসনের অংশ হিসেবে রাজধানীর চারটি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল শহরের বাইরে স্থানান্তরের যে সরকারি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)। সংস্থাটির মতে, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে উল্টোভাবে জনভোগান্তি, ব্যয় এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
রবিবার এক বিবৃতিতে আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, কেবল টার্মিনাল স্থানান্তর করলেই ঢাকার যানজট সমস্যার টেকসই সমাধান হবে না। বরং কার্যকর গণপরিবহন সংযোগ, সমন্বিত পরিকল্পনা এবং পরিবহন ব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এই উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাজধানীর ফুলবাড়িয়া-গুলিস্তান টার্মিনাল কেরানীগঞ্জে, মহাখালী টার্মিনাল অস্থায়ীভাবে পূর্বাচলে এবং পরে টঙ্গীর কাছে, গাবতলী টার্মিনাল হেমায়েতপুরে এবং সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী টার্মিনাল কাঁচপুরে স্থানান্তরের কথা রয়েছে। তবে আইপিডি বলছে, এসব স্থান মূল শহর থেকে প্রায় ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে হওয়ায় যাত্রীদের জন্য এটি বড় ধরনের ভোগান্তির কারণ হবে।
প্রতিষ্ঠানটির মতে, নতুন টার্মিনাল এলাকাগুলোতে এখনো পর্যাপ্ত ও সাশ্রয়ী গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে দূরপাল্লার যাত্রীদের শহরে প্রবেশ করতে অতিরিক্ত ভাড়া, সময় এবং যাতায়াত ঝুঁকি বহন করতে হবে। বিশেষ করে নারী, শিশু, বয়স্ক এবং নিম্নআয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি সমস্যার মুখে পড়বেন।
আইপিডি আরও উল্লেখ করেছে, টার্মিনালগুলো শহরের প্রান্তে সরানো হলে যাত্রীরা সিএনজি, রাইড-শেয়ারিং বা ছোট যানবাহনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। এতে রাজধানীর প্রবেশমুখগুলোতে নতুন করে যানজট তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে মেট্রোরেল ও বিদ্যমান বাস নেটওয়ার্কের ওপরও অতিরিক্ত চাপ পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নিরাপত্তার বিষয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে সংস্থাটি। তাদের মতে, রাত বা ভোরে দূরবর্তী টার্মিনাল থেকে যাতায়াতের সময় নারী ও শিশু যাত্রীরা নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
আইপিডি দাবি করেছে, বিশ্বের অনেক উন্নত শহরে কেন্দ্রীয় এলাকাতেই আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল অবস্থিত, যা যাতায়াতকে সহজ ও সাশ্রয়ী করে। তাই ঢাকায় বিদ্যমান টার্মিনাল সরিয়ে না দিয়ে বরং সেগুলোর ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং অবকাঠামো আধুনিকায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
সংস্থাটি সরকারের কাছে ৮ দফা সুপারিশও তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে—চারটি টার্মিনাল স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত বাতিল, টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, নতুন বাস ডিপো নির্মাণ, মানসম্মত ফিডার সার্ভিস চালু, বাস রুট রেশনালাইজেশন, চাঁদাবাজি বন্ধ, যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং টার্মিনালগুলোকে মাল্টিমোডাল পরিবহন হাবে রূপান্তর।
আইপিডির মতে, ঢাকার পরিবহন খাতে টেকসই সমাধান আনতে হলে স্থানান্তর নয়, বরং বিদ্যমান অবকাঠামোর কার্যকর ব্যবহার ও সমন্বিত নগর পরিকল্পনাই হতে পারে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ।
কসমিক ডেস্ক