পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার রতনদী তালতলী ইউনিয়নে তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙন এখন স্থানীয় মানুষের জীবনে এক ভয়াবহ বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বছরের পর বছর ধরে চলা এই নদীভাঙনে ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, রাস্তা এমনকি কবরস্থান পর্যন্ত বিলীন হয়ে যাচ্ছে নদীগর্ভে। ফলে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন অন্তত ৫০০ পরিবার।
স্থানীয় বাসিন্দা বারেক রাঢ়ীর কণ্ঠে ফুটে উঠেছে এই দুর্দশার বাস্তব চিত্র। তিনি বলেন, প্রতিবছর বেড়িবাঁধ মেরামত করা হলেও বর্ষা এলেই আবার ভেঙে যায়। ফলে ঘরবাড়ি হারানোর পাশাপাশি বাপ-দাদার কবরও নদীতে হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় থাকতে হয় তাদের। চারবার বাড়ি করেও এখন আর নতুন করে ঘর তোলার সামর্থ্য নেই বলে জানান তিনি।
এই অঞ্চলের নিজহাওলা, বন্যাতলী স্লুইসের উত্তর ও দক্ষিণ পাশ, গ্রামর্দনসহ কয়েকটি গ্রাম সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। ঢেউয়ের আঘাতে প্রতিদিনই বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বন্যাতলী লঞ্চঘাটের উত্তর পাশে প্রায় ৫০০ মিটার সড়ক ইতোমধ্যে ধসে পড়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দা শাহজাহান হাওলাদার জানান, নদীভাঙনে তারা সর্বস্ব হারিয়েছেন। কয়েক দফা বাড়ি নির্মাণ করেও শেষ পর্যন্ত সবকিছু নদীগর্ভে চলে গেছে। প্রায় সাড়ে আট একর জমি ইতোমধ্যে হারিয়ে গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তার মতে, এখন আর সাধারণ মেরামত দিয়ে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়, বরং প্রয়োজন টেকসই ও শক্তিশালী বাঁধ।
একই এলাকার আরেক বাসিন্দা ফরিদ হাওলাদার জানান, বহু বছর আগে নদীভাঙনে ঘরবাড়ি হারিয়ে এখন অন্যত্র বসবাস করছেন তিনি। তার ভাষায়, শত শত ঘরবাড়ি ইতোমধ্যে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। প্রতিনিয়ত নতুন করে ভাঙন বাড়ছে, এমনকি রাস্তার অংশও ধসে যাচ্ছে।
স্থানীয় নারী লুৎফা বেগমও জানান, তাদের জীবনের সবকিছুই এখন নদীভাঙনের স্মৃতি। একসময় যে জমিতে চাষাবাদ ও জীবিকা চলত, তা এখন নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে। প্রায় ৫০ একরের মতো জমি ইতোমধ্যে বিলীন হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা খান বলেন, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করে এবং এতে বেড়িবাঁধ, সড়ক, কৃষিজমি ও বসতবাড়ি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি দ্রুত টেকসই বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান, অন্যথায় এলাকার বড় অংশ ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাবে বলে সতর্ক করেন।
গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবুজর মো. ইজাজুর হক জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ রক্ষায় ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে এবং বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই কাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে স্থানীয়দের আশঙ্কা, কেবল মেরামত নয়, দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধান না হলে প্রতি বছরই এই দুর্ভোগ আরও বাড়বে। নদীর ভাঙনে শুধু ঘরবাড়ি নয়, হারিয়ে যাচ্ছে জীবনের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ স্বপ্ন। এখন তাদের একটাই দাবি—স্থায়ী বেড়িবাঁধ, যা তাদের শেষ আশ্রয়টুকু রক্ষা করতে পারে।
কসমিক ডেস্ক