খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবেশগত সংবেদনশীল একটি বনাঞ্চল পুড়িয়ে ফেলার ঘটনায় শিক্ষার্থী ও পরিবেশবিদদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ ও সমালোচনা দেখা দিয়েছে। ঘটনাটি ঘটে বিশ্ববিদ্যালয়ের অদম্য বাংলা এলাকার পেছনে অবস্থিত বধ্যভূমি সংলগ্ন ভাসমান হোগলা বনে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বনাঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, জলজ প্রাণী ও কীটপতঙ্গের নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত ছিল।
জানা যায়, গত ২৩ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট শাখার পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা এলাকাটি পরিষ্কার করার অংশ হিসেবে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন। এতে প্রায় দুই একর ভাসমান হোগলা বন সম্পূর্ণভাবে পুড়ে যায়।
এই বনাঞ্চলটি ছিল সাদা বক, পানকৌড়ি, মাছরাঙা এবং আরও অনেক স্থানীয় পাখির প্রজনন ও বাসস্থানের জায়গা। আগুন লাগার পর থেকে সেখানে এসব পাখির উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘মিনি সুন্দরবন’ হিসেবে গড়ে তোলার একটি প্রকল্পের অংশ হিসেবে এই এলাকায় সুন্দরবনের বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সেই পরিকল্পনার প্রস্তুতি হিসেবে বন পরিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তবে এই পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষার্থী ও পরিবেশ সচেতন মহল। তাদের মতে, আগুন ব্যবহার করে বন পরিষ্কার করা পরিবেশবান্ধব কোনো পদ্ধতি নয়, বরং এটি জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ফাইরুজ জাহিন খান বলেন, আগে এই এলাকায় নিয়মিত নানা প্রজাতির পাখি দেখা যেত। হোগলা বনের ভেতর তাদের বাসাও ছিল। এখন সেই আবাসস্থল সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।
তিনি আরও বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পের নামে প্রকৃতিকে ধ্বংস করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। পরিবেশবান্ধব বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহার করা যেত।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট শাখার প্রধান মোহাম্মদ আলী জানান, ‘মিনি সুন্দরবন’ প্রকল্প বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই এই পরিষ্কার কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী আগুন দেওয়া হয় বলে তিনি দাবি করেন।
তবে পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী এই পদ্ধতিকে সমালোচনা করে বলেন, পেট্রল দিয়ে বন পুড়িয়ে পরিষ্কার করা কোনোভাবেই বিজ্ঞানসম্মত বা পরিবেশবান্ধব নয়।
তার মতে, এতে শুধু গাছপালা নয়, পাখি, জলজ প্রাণী, কেঁচোসহ অনেক উপকারী অণুজীবও ধ্বংস হয়েছে। এমনকি মাটির স্বাভাবিক ভারসাম্যও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, সুন্দরবনের গাছ যেমন গোলপাতা এবং হোগলা একসঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে ওঠে। তাই আগুন দিয়ে বন পরিষ্কার করার কোনো প্রয়োজন ছিল না।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সঙ্গে পরামর্শ করলে এই প্রকল্পটি আরও টেকসই ও পরিবেশবান্ধবভাবে বাস্তবায়ন করা যেত।
বর্তমানে ঘটনাটি ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে ও বাইরে সমালোচনা চলছে। অনেকেই এটিকে পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন।
সব মিলিয়ে, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে হোগলা বন পুড়িয়ে ফেলার ঘটনা খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ নীতিমালা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
কসমিক ডেস্ক