সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সফল ও জনপ্রিয় দল। পাঁচবারের বিশ্বকাপ জয়, অসংখ্য কিংবদন্তি ফুটবলার এবং ‘জোগো বোনিতো’ বা নান্দনিক ফুটবলের ঐতিহ্য—সব মিলিয়ে দলটি বিশ্বজুড়ে কোটি ভক্তের ভালোবাসা পেয়েছে। তবে এত সাফল্য ও জনপ্রিয়তার পরও অনেক ফুটবলপ্রেমী আছেন, যারা ব্রাজিলকে সমর্থন করতে চান না। আধুনিক ফুটবলের পরিবর্তন, দলের কৌশলগত দুর্বলতা এবং কিছু মানসিক ও সাংস্কৃতিক কারণের জন্য তাদের এই অনীহা তৈরি হয়েছে। জেনে নেওয়া যাক, কেন অনেক ফুটবলপ্রেমী ব্রাজিল সমর্থন করেন না।
প্রথমত, ব্রাজিলের ফুটবল এখন আর আগের মতো আবেগময় ও নান্দনিক নেই—এমন অভিযোগ অনেকের। একসময় ব্রাজিল মানেই ছিল চোখধাঁধানো ড্রিবল, আক্রমণাত্মক খেলা এবং দর্শক মাতানো ফুটবল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দলটি অনেক বেশি ফলাফলনির্ভর ও রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলছে। ফলে যারা ব্রাজিলকে ‘জোগো বোনিতো’র প্রতীক হিসেবে দেখতেন, তারা এখন হতাশ। তাদের মতে, দলটি সৌন্দর্যের চেয়ে নিরাপদ ফলাফলের দিকে বেশি ঝুঁকছে।
দ্বিতীয়ত, দলীয় শৃঙ্খলার অভাবও ব্রাজিলবিরোধী মনোভাবের একটি বড় কারণ। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে অনেক সময় খেলোয়াড়দের অতিরিক্ত আবেগ, অপ্রয়োজনীয় ফাউল, লাল কার্ড পাওয়া কিংবা মাঠের বাইরের বিতর্ক দলকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ফুটবলপ্রেমীদের একাংশ মনে করেন, বড় মঞ্চে সফল হতে হলে শুধু প্রতিভা নয়, শৃঙ্খলাও জরুরি। এই জায়গায় ব্রাজিল অনেক সময় পিছিয়ে পড়ে।
তৃতীয়ত, ব্রাজিলের দীর্ঘ ট্রফি খরা অনেক সমর্থকের হতাশার কারণ। রেকর্ড পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হলেও দলটি প্রায় দুই যুগ ধরে বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। ২০০২ সালের পর থেকে বারবার প্রত্যাশা জাগালেও শেষ পর্যন্ত তারা ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে নকআউট পর্বে অপ্রত্যাশিত বিদায় ব্রাজিলকে নিয়ে সমর্থকদের আস্থা কমিয়ে দিয়েছে।
চতুর্থত, আধুনিক ফুটবলে ইউরোপীয় দলগুলোর আধিপত্যও ব্রাজিলের প্রতি অনাগ্রহ বাড়িয়েছে। জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন বা ইংল্যান্ডের মতো দলগুলো এখন ট্যাকটিক্যালভাবে অনেক বেশি সংগঠিত, শারীরিকভাবে শক্তিশালী এবং পরিকল্পিত ফুটবল খেলছে। এর বিপরীতে লাতিন আমেরিকান স্টাইল অনেক সময় পুরনো বা কম কার্যকর মনে হয়। ফলে কিছু দর্শক ইউরোপীয় ফুটবলের দিকে বেশি ঝুঁকছেন।
পঞ্চমত, ব্রাজিলের তারকা-নির্ভরতা অনেকের কাছে বিরক্তিকর। দলটি প্রায়ই এক বা দুইজন বড় তারকার ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করে। এতে দলগত ভারসাম্য নষ্ট হয় বলে মনে করেন সমালোচকেরা। ফুটবল একটি দলগত খেলা হলেও ব্রাজিলকে অনেক সময় ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের ওপর বেশি নির্ভরশীল মনে হয়। এই প্রবণতা দলকে বড় ম্যাচে দুর্বল করে তোলে।
ষষ্ঠত, ২০১৪ বিশ্বকাপের ‘সেভেন আপ’ ট্রমা এখনো ব্রাজিল ভক্তদের তাড়া করে বেড়ায়। জার্মানির বিপক্ষে ৭-১ গোলের সেই ঐতিহাসিক হার ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় ধাক্কা। এই লজ্জাজনক পরাজয় শুধু ব্রাজিল সমর্থকদের নয়, অনেক নিরপেক্ষ দর্শকের কাছেও দলটির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। অনেকে এখনো সেই ম্যাচের কথা মনে করে ব্রাজিলকে ট্রল করেন, আর সেই ট্রলের ভয়ে কেউ কেউ দলটিকে সমর্থন করতেই চান না।
সপ্তমত, বর্তমান বিশ্ব ফুটবলে নতুন ও ভারসাম্যপূর্ণ দলের উত্থানও ব্রাজিলের জনপ্রিয়তায় প্রভাব ফেলছে। আর্জেন্টিনা, পর্তুগাল, ফ্রান্স, এমনকি জাপানের মতো দলগুলোও এখন কৌশলগতভাবে শক্তিশালী ও সংগঠিত ফুটবল খেলছে। ফলে ফুটবলপ্রেমীরা নতুন নতুন দলের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন। একসময় ব্রাজিল ছিল অনেকের স্বাভাবিক পছন্দ, কিন্তু এখন বিকল্প বেড়ে যাওয়ায় সমর্থনের ধারা বদলাচ্ছে।
তবে ব্রাজিল সমর্থকদের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের মতে, পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের অর্জনকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। ট্রল, সমালোচনা বা ব্যঙ্গ—কিছুই তাদের ইতিহাস মুছে ফেলতে পারবে না। মাঠের সাফল্যই ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় পরিচয়। তাই সেভেন আপ নিয়ে যতই হাসিঠাট্টা হোক, তারা নিজেদের শিরোপার সংখ্যাই সামনে আনেন।
বাংলাদেশেও ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থকদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এক ধরনের উৎসবে পরিণত হয়েছে। পতাকার দৈর্ঘ্য নিয়ে প্রতিযোগিতা, জার্সি মিছিল, ব্যানার, পোস্টার কিংবা ট্রফির প্রতিকৃতি প্রদর্শন—সবই ফুটবলকে ঘিরে তৈরি হওয়া আবেগের অংশ। তবে ফুটবল সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এসব প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন সৌহার্দ্যপূর্ণ থাকে। মাঠের লড়াই আর সমর্থকদের উচ্ছ্বাস যেন ব্যক্তিগত বিরোধে রূপ না নেয়—এটাই হওয়া উচিত ফুটবল সংস্কৃতির সৌন্দর্য।
কসমিক ডেস্ক