সুন্দরবনের কুখ্যাত ‘দুলাভাই বাহিনী’র বিরুদ্ধে কোস্ট গার্ডের বিশেষ অভিযানে একজন নিহত এবং দুজনকে আটক করা হয়েছে। অভিযানে ছয়টি একনলা বন্দুক, ৬৯টি তাজা কার্তুজ, তিনটি ফাঁকা কার্তুজ, একটি দেশীয় অস্ত্র, একটি মোবাইল ফোন ও একটি হাতঘড়ি উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। শনিবার (২৭ জুন) কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সুন্দরবনে সক্রিয় বনদস্যু বাহিনী নির্মূল এবং বনজীবী, জেলে ও উপকূলীয় মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোস্ট গার্ড নিয়মিতভাবে ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’ পরিচালনা করছে। এরই অংশ হিসেবে গত ২৫ জুন বিকেল থেকে টানা দুই দিন খুলনার কয়রা উপজেলার বনপাড়া-সংলগ্ন সুন্দরবনের গভীর এলাকায় বিশেষ অভিযান চালায় কোস্ট গার্ডের মোংলা বেইস, কয়রা স্টেশন ও নলিয়ান স্টেশনের সদস্যরা।
কোস্ট গার্ডের দাবি, অভিযানের সময় ডাকাতদের বহনকারী দুটি নৌকা শনাক্ত করা হয়। নৌকাগুলোকে থামার সংকেত দিলে সেগুলোতে থাকা ব্যক্তিরা সংকেত উপেক্ষা করে কোস্ট গার্ড সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। আত্মরক্ষার্থে কোস্ট গার্ডও পাল্টা গুলি চালায়। একপর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে তীব্র বন্দুকযুদ্ধ শুরু হয়। সংঘর্ষের সময় ডাকাতদের একটি নৌকায় আগুন ধরে যায় এবং অন্যটি ডুবে যায়। অভিযানে কোস্ট গার্ড এক রাউন্ড ব্ল্যাঙ্ক কার্টিজ ও ২১৬ রাউন্ড গুলি ছোড়ে।
বন্দুকযুদ্ধ শেষে ঘটনাস্থল থেকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় দুলাভাই বাহিনীর প্রধান রবিউল ইসলাম (৫০) এবং সদস্য শওকত সরদারকে (৫৫) উদ্ধার করা হয়। তাদের দ্রুত কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক শওকত সরদারকে মৃত ঘোষণা করেন। গুরুতর আহত রবিউল ইসলামকে পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
অভিযানের পর পালিয়ে যাওয়া অন্য সদস্যদের ধরতে কোস্ট গার্ড ও পুলিশের যৌথ অভিযানও চালানো হয়। এ সময় মঠবাড়িয়া পুলিশ ফাঁড়ির সামনে স্থানীয় মানুষের সহায়তায় পরিচালিত অভিযানে ইসরাফিল হাওলাদার (২৬) নামে আরও একজনকে আটক করা হয়। তার হাতের আঙুলে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে ধরা হয়। পরে তাকে কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। ইসরাফিলের বাড়ি সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলায় বলে জানা গেছে।
অভিযান শেষে আরশিবসা নদীর বেসুখাল এলাকা থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত সামগ্রীর মধ্যে ছিল ছয়টি একনলা বন্দুক, ৬৯ রাউন্ড তাজা কার্তুজ, তিন রাউন্ড ফাঁকা কার্তুজ, একটি দেশীয় অস্ত্র, একটি মোবাইল ফোন এবং একটি হাতঘড়ি। কোস্ট গার্ডের মতে, এসব অস্ত্র ও সরঞ্জাম বনদস্যুদের দীর্ঘদিনের অপরাধমূলক তৎপরতার প্রমাণ বহন করে।
কোস্ট গার্ড জানায়, আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। নিহত শওকত সরদারের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কয়রা থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। একই সঙ্গে উদ্ধার হওয়া অস্ত্র ও অন্যান্য আলামতও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, সুন্দরবনকে সম্পূর্ণ দস্যুমুক্ত করতে ডাকাত ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। বনজীবী, জেলে এবং উপকূলীয় মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই কোস্ট গার্ডের প্রধান লক্ষ্য। পাশাপাশি দস্যুদের অবস্থান, চলাচল ও তৎপরতা সম্পর্কে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার জন্য স্থানীয় জনগণের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। তথ্যদাতার পরিচয় গোপন রাখা হবে বলেও আশ্বাস দেওয়া হয়।
সুন্দরবন দীর্ঘদিন ধরে বনদস্যুদের তৎপরতার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। মাছ ধরা, কাঁকড়া আহরণ, গোলপাতা সংগ্রহ কিংবা বনজ সম্পদ আহরণের কাজে যাওয়া মানুষ প্রায়ই অপহরণ, চাঁদাবাজি ও হামলার শিকার হন। এ কারণে কোস্ট গার্ডের এমন অভিযান স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তি ও নিরাপত্তার অনুভূতি তৈরি করেছে।
সব মিলিয়ে, সুন্দরবনে কোস্ট গার্ডের এই অভিযান কুখ্যাত দুলাভাই বাহিনীর বিরুদ্ধে বড় ধরনের সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে এটি বনদস্যু দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানেরও স্পষ্ট বার্তা বহন করছে।
কসমিক ডেস্ক