বর্ষা এলেই নড়াইল জেলার বিভিন্ন গ্রামীণ জনপদের মানুষের জন্য শুরু হয় নতুন দুর্ভোগের অধ্যায়। বৃষ্টির পানিতে কাঁচা সড়ক কাদায় পরিণত হওয়ায় যানবাহন চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এতে শিক্ষার্থী, কৃষক, শ্রমজীবী মানুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বাসিন্দাদের প্রতিদিনের চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে।
এমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক নড়াইল সদর উপজেলার কলোড়া ইউনিয়নের নিরালী গ্রাম থেকে শেখহাটি ইউনিয়নের দেবভোগ পর্যন্ত সংযোগ স্থাপনকারী নিরালী-দেবভোগ সড়ক। প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ এই কাঁচা সড়কটি বর্ষা মৌসুমে অধিকাংশ জায়গায় হাঁটুসমান কাদায় ঢেকে যায়। ফলে জরুরি প্রয়োজনে রোগী হাসপাতালে নেওয়া, কৃষিপণ্য বাজারে পৌঁছানো কিংবা শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাওয়া—সব ক্ষেত্রেই সৃষ্টি হয় মারাত্মক ভোগান্তি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, নদীর তীরঘেঁষা এই সড়ক দীর্ঘদিন ধরে পাকা করার দাবি জানিয়ে এলেও বাস্তবে কোনো অগ্রগতি হয়নি। বিভিন্ন সময় সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে আবেদন জানানো হলেও স্থায়ী সমাধান মেলেনি বলে অভিযোগ তাদের।
শুধু নিরালী-দেবভোগ সড়কই নয়, মুলিয়া ইউনিয়নের পানতিতা নদীর তীর ঘেঁষে আখুদা-দেবভোগ-এগারোখান সড়কটিও এখনও কাঁচা রয়েছে। কয়েকশ পরিবার এই সড়কের ওপর নির্ভরশীল হলেও বর্ষায় চলাচল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে ওঠে।
সরেজমিনে দেখা যায়, নিরালী-দেবভোগ সড়কের বিভিন্ন অংশ কাদায় ঢেকে রয়েছে। অনেক স্থানে হেঁটে চলাও কঠিন হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের দাবি, বছরের অন্যান্য সময় সীমিতভাবে চলাচল সম্ভব হলেও বর্ষাকালে সড়কটি কার্যত ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে যায়।
নিরালী গ্রামের বাসিন্দা সম্রাট বিশ্বাস জানান, ছোটবেলা থেকেই তিনি এই কাঁচা সড়ক ব্যবহার করছেন। এলাকার অধিকাংশ পরিবার পান চাষের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু যানবাহন চলাচলের সুযোগ না থাকায় বাজারে পান পৌঁছাতে অনেক সময় মাথায় করে বহন করতে হয়। এতে উৎপাদন ব্যয় ও শ্রম—দুটিই বেড়ে যায়।
দেবভোগ গ্রামের বাসিন্দা বাবুল বিশ্বাসের দাবি, নির্বাচন এলেই সড়ক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, কিন্তু বাস্তবায়ন আর হয় না। ফলে বছরের পর বছর একই দুর্ভোগ বহন করতে হচ্ছে।
শিক্ষার্থীরাও এই সমস্যার বাইরে নয়। পানতিতা গ্রামের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী পপি রায় জানায়, বর্ষাকালে প্রতিদিন কাদা মাড়িয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হয়। এতে সময় যেমন বেশি লাগে, তেমনি দুর্ঘটনার আশঙ্কাও থাকে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, নড়াইল জেলার আওতায় মোট এক হাজার ৪৪৭টি গ্রামীণ সড়কের দৈর্ঘ্য প্রায় তিন হাজার ২২৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ সড়ক এখনও কাঁচা। সদর উপজেলায় মোট ১,১৮১ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ৭৩৮ কিলোমিটার, লোহাগড়ায় ১,১৯৯ কিলোমিটারের মধ্যে ৭৮৯ কিলোমিটার এবং কালিয়া উপজেলায় ৭৪৫ কিলোমিটারের মধ্যে ৪৩৩ কিলোমিটার কাঁচা রয়েছে।
স্থানীয় সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার ইকরামুল কবীর জানান, জেলার বিভিন্ন কাঁচা সড়ক উন্নয়নে একাধিক প্রকল্পের কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। কিছু সড়কের টেন্ডার কার্যক্রম চলছে এবং কয়েকটি সড়ক জেলা অবকাঠামো উন্নয়ন ও বৃহত্তর যশোর জেলা অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্প অনুমোদন পেলে আগামী অর্থবছরে জেলার কাঁচা সড়কের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে।
কসমিক ডেস্ক