আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও ব্যবসায়ী নেতারা দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। তাদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণের সুদহার, করের চাপ এবং জ্বালানি সংকটের কারণে বেসরকারি খাত কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোতে পারছে না। ফলে নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ কমছে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির উদ্যোগে রাজধানীর কাকরাইলে দ্য ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশের মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এ আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সমিতির অন্তর্বর্তীকালীন কমিটির আহ্বায়ক মাহবুব উল্লাহ এবং সঞ্চালনা করেন সদস্যসচিব মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন।
আলোচনায় অংশ নেওয়া বক্তারা বলেন, বর্তমানে দেশের অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান নানা কারণে চাপের মধ্যে রয়েছে। নতুন শিল্প স্থাপনের পাশাপাশি বিদ্যমান শিল্পকারখানাকে টিকিয়ে রাখার বিষয়েও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুর জন্য প্রণোদনা তহবিল গঠনের উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত না হলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সরকার বাজেট প্রণয়নে অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণের ধারণাকে গুরুত্ব দিয়েছে, যাতে দেশের সব শ্রেণির মানুষ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। তিনি উল্লেখ করেন, অর্থনীতিকে সীমিত গোষ্ঠীর প্রভাব থেকে বের করে আরও অংশগ্রহণমূলক কাঠামোর দিকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
আলোচনা সভায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অর্থনীতিবিদরা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তারা বলেন, বর্তমান অর্থনীতি একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, পুনরুদ্ধার এবং কাঠামোগত সংস্কার—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে নীতি নির্ধারণ করতে হবে। অন্যথায় মূল্যস্ফীতির চাপ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সুরক্ষা নিয়েও আলোচনা হয়। বক্তারা বলেন, শিক্ষা খাতে শুধু অবকাঠামো নয়, শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নেও বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধি, নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থার সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ সংস্থা আইসিবির চেয়ারম্যান আবু আহমেদ বলেন, কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জনে বেসরকারি খাতের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। এজন্য ঋণের সুদহার কমানো প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন। তার মতে, সুদহার কমলে যেসব উদ্যোক্তার বিনিয়োগের সক্ষমতা রয়েছে, তারা নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নে আগ্রহী হবেন এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বাড়বে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নুরুল আমিন বলেন, ব্যাংকিং খাতে জনগণের আস্থা দ্রুত পুনরুদ্ধার করা জরুরি। অন্যদিকে ব্যবসায়ী নেতারা জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রাজস্ব প্রশাসনে প্রয়োজনীয় সংস্কারের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন। তাদের মতে, ব্যবসাবান্ধব নীতিমালা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত হলে বেসরকারি বিনিয়োগে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
অনুষ্ঠানে অর্থনীতিবিদ, গবেষক, শিক্ষক এবং বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আলোচনায় উঠে আসা মতামতগুলোতে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সমন্বিত নীতি গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়।
কসমিক ডেস্ক