রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার চলমান যুদ্ধ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক মাইলফলক অতিক্রম করেছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধটি ১,৫৬৯ দিন পেরিয়ে গেছে, যা এটিকে আধুনিক যুগের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে পরিণত করেছে। এই সময়কাল এখন First World War-এর সময়সীমাকেও ছাড়িয়ে গেছে এবং Second World War-এর কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে।
এই সংঘাত শুরু হয় ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে, যখন Russia ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করে। প্রাথমিকভাবে মস্কো দ্রুত বিজয়ের আশা করেছিল এবং রাজধানী কিয়েভ দখলের পরিকল্পনা নিয়েছিল। তবে ইউক্রেনের তীব্র প্রতিরোধ সেই পরিকল্পনাকে ব্যর্থ করে দেয়। ফলে যুদ্ধ দ্রুত এক স্বল্পমেয়াদি অভিযানের বদলে দীর্ঘস্থায়ী এবং ক্লান্তিকর সংঘাতে রূপ নেয়।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, বিশেষ করে New York Times-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জনমত জরিপ অনুযায়ী ইউক্রেনের প্রায় অর্ধেক মানুষ মনে করেন যুদ্ধ আগামী এক বছরের মধ্যেও শেষ হবে না। এই ধারণা যুদ্ধের অনিশ্চয়তা ও দীর্ঘস্থায়িত্বকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।
সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই যুদ্ধের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো স্থবিরতা। দীর্ঘ সময় ধরে উভয় পক্ষ প্রায় একই অবস্থানে থেকে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। এটি অনেকটা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরিখা যুদ্ধের মতো, যেখানে সৈন্যরা বাংকার ও সুরক্ষিত অবস্থান থেকে দীর্ঘ সময় যুদ্ধ করেছিল।
ফরাসি সামরিক ইতিহাসবিদ মিশেল গোয়া বলেন, যখন যুদ্ধক্ষেত্র দীর্ঘ সময় ধরে স্থবির হয়ে পড়ে, তখন তা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। ইউক্রেন যুদ্ধেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে, যেখানে গোলন্দাজ বাহিনী এবং প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তবে এই যুদ্ধের একটি বড় পার্থক্য হলো আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার। বিশেষ করে ড্রোন এখন যুদ্ধের প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠেছে। এগুলো নজরদারি, লক্ষ্য শনাক্তকরণ এবং নির্ভুল হামলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অনেক ক্ষেত্রে ড্রোন প্রচলিত ট্যাংক ও ভারী অস্ত্রের কার্যকারিতাকেও চ্যালেঞ্জ করছে।
ড্রোন ব্যবহারের ফলে পরিখা যুদ্ধের ধরনও পরিবর্তিত হয়েছে। এখন সৈন্যদের ছোট ছোট, গভীর ও আড়াল করা আশ্রয়ে থাকতে হচ্ছে, কারণ বড় চলাচল দ্রুত শনাক্ত করা যায়। ট্যাংক ও বড় সামরিক যানও আকাশ থেকে সহজেই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে।
যুদ্ধটি শুধু সামরিক দিক থেকেই নয়, ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকেও গভীর প্রভাব ফেলছে। রাশিয়ার অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ তেল ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর ইউক্রেনের ড্রোন হামলা যুদ্ধের কৌশলগত দিককে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ ইউরোপের আধুনিক ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংঘাতে পরিণত হওয়ার পথে রয়েছে। যদিও এটি বহু মহাদেশে বিস্তৃত কোনো বিশ্বযুদ্ধ নয়, তবুও এর প্রভাব এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তন বৈশ্বিক সামরিক কৌশলে বড় পরিবর্তন আনছে।
ইউক্রেনের বিভিন্ন অংশে ধ্বংসযজ্ঞ, অবিরাম গোলাবর্ষণ এবং শহরাঞ্চলের ক্ষতচিহ্ন অনেক পর্যবেক্ষককে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দৃশ্যের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, সরাসরি তুলনার সীমাবদ্ধতা রয়েছে, কারণ বর্তমান যুদ্ধের কাঠামো ও প্রযুক্তি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
তবুও একটি বিষয় স্পষ্ট—এই সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং এটি আধুনিক যুদ্ধের সংজ্ঞা ও ভবিষ্যৎ কৌশলকে নতুনভাবে গড়ে দিচ্ছে।
কসমিক ডেস্ক